প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ধেয়ে আসা শক্তিশালী টাইফুন চাম্পির আঘাতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে তাইওয়ানের বিভিন্ন এলাকা। ঝোড়ো বাতাস, প্রবল বৃষ্টি ও উত্তাল ঢেউয়ের কারণে একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং পাঁচ শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। উপড়ে পড়েছে অসংখ্য গাছ, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা এবং ব্যাহত হয়েছে বিমান চলাচল। পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি উদ্ধার ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম চালিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
২৪ অক্টোবর তাইওয়ানের উত্তর-পূর্ব উপকূল অতিক্রম করে ঝড়টি উত্তর দিকে সরে যেতে শুরু করে। এর আগে কয়েক দিন ধরে দ্বীপটির বিভিন্ন অঞ্চলে ঝড়ের প্রভাব অনুভূত হচ্ছিল। শক্তিশালী বাতাস ও বৃষ্টির কারণে মানুষের স্বাভাবিক চলাচল থেকে শুরু করে শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং পরিবহনব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে।
প্রবল বাতাস ও ঢেউয়ে প্রাণহানি
তাইওয়ানের জরুরি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ঝড়ের কারণে একজনের মৃত্যু হয়েছে। লিউচিউ দ্বীপ এলাকায় উত্তাল সমুদ্রের ঢেউয়ে ভেসে যান এক ব্যক্তি। পরে উদ্ধারকারীরা তাঁকে উদ্ধার করলেও তাঁর প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে ঝড়ের প্রভাবে আহত মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে পাঁচ শতাধিক আহতের কথা জানানো হয়। আহতদের মধ্যে কেউ সড়ক দুর্ঘটনা, কেউ পড়ে গিয়ে এবং কেউ ঝড়ের সময় উড়ে আসা বা ভেঙে পড়া বস্তুতে আঘাত পেয়ে আহত হন।
টাইফুনের সময় সমুদ্র উত্তাল থাকায় উপকূলীয় এলাকায় ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। আবহাওয়া পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে এবং সমুদ্রের কাছাকাছি বিপজ্জনক স্থানে যাতায়াত এড়িয়ে চলতে বলা হয়।
বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন, উপড়ে পড়েছে গাছ
চাম্পির শক্তিশালী বাতাসে বিভিন্ন এলাকায় গাছ ভেঙে পড়ে এবং সড়কে যান চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। কিছু স্থানে বিদ্যুতের লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিপুলসংখ্যক বাড়ি বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত মেরামতের কাজ শুরু করে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় স্বাভাবিক পরিষেবা ফিরিয়ে আনতে সময় লাগে।
তাইওয়ানের রাজধানী তাইপেসহ উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় ঝোড়ো বাতাস ও বৃষ্টির প্রভাব পড়ে। রাস্তাঘাটে ভাঙা ডালপালা ও উপড়ে পড়া গাছ সরাতে কর্মীদের কাজ করতে হয়। কোথাও কোথাও বৃষ্টির কারণে দৃশ্যমানতা কমে যায় এবং চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ঝড়ের প্রভাব মোকাবিলায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। পরিস্থিতির কারণে উত্তর ও মধ্য তাইওয়ানের বিভিন্ন এলাকায় টানা দ্বিতীয় দিনের মতো স্কুল ও অফিস বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিমান চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন
টাইফুনের কারণে বিমান পরিবহনেও ব্যাপক প্রভাব পড়ে। নিরাপত্তার স্বার্থে শত শত ফ্লাইট বাতিল করা হয়। এর ফলে যাত্রীদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হয় এবং বিমানবন্দরগুলোতে চাপ তৈরি হয়।
২৪ অক্টোবর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেদিন ২৪২টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছিল। আগের দিন বাতিল হওয়া ফ্লাইটের সংখ্যা ছিল আরও বেশি। আবহাওয়ার উন্নতি এবং বাতাসের গতিবেগ কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে বিমান চলাচল স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তবে ঝড়ের গতিপথ ও বাতাসের তীব্রতা বিবেচনায় নিয়ে বিমান সংস্থাগুলোকে সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। দুর্যোগের সময় এ ধরনের সতর্কতা যাত্রী ও বিমানকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সুপার টাইফুন থেকে দুর্বল ঝড়ে রূপান্তর
চাম্পি একপর্যায়ে সুপার টাইফুনে পরিণত হয়েছিল এবং চলতি বছরের প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শক্তিশালী ঝড়গুলোর মধ্যে অন্যতম হয়ে উঠেছিল। পরে তাইওয়ানের কাছ দিয়ে অতিক্রম করার সময় এর শক্তি কমতে শুরু করে।
তবে দুর্বল হয়ে পড়ার পরও ঝড়টির কেন্দ্রে বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ১২৬ কিলোমিটার ছিল বলে আবহাওয়াবিদেরা জানান। ঝড়টি তাইওয়ানের উত্তর-পূর্ব উপকূলের কাছ দিয়ে অতিক্রম করে উত্তর দিকে এগিয়ে যায়। পরে চীনের উপকূলের দিকে অগ্রসর হলেও সরাসরি সেখানে আছড়ে পড়ার সম্ভাবনা কম বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।
ঝড়ের গতিপথ পরিবর্তন এবং সমুদ্রের ওপর এর চলাচল পরিস্থিতিকে কিছুটা জটিল করে তোলে। তাইওয়ানের আবহাওয়া কর্তৃপক্ষ ঝড়ের অবস্থান, বাতাসের গতি এবং সমুদ্রের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতির গুরুত্ব
তাইওয়ান নিয়মিত টাইফুনের মুখোমুখি হওয়ায় দুর্যোগ মোকাবিলায় দেশটির পূর্বপ্রস্তুতি রয়েছে। আগাম সতর্কতা, পরিবহন বন্ধ রাখা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কার্যক্রম সীমিত করার মতো পদক্ষেপ প্রাণহানি কমাতে সাহায্য করে। তবু চাম্পির মতো শক্তিশালী ঝড় বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও দৈনন্দিন জীবনকে বড় ধরনের চাপে ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু ও আবহাওয়ার পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে শুধু ঝড়ের সর্বোচ্চ গতিবেগ নয়, এর গতিপথ, বৃষ্টিপাত এবং সমুদ্রের অবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই আগাম সতর্কতা পাওয়ার পর নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়া, উপকূলীয় এলাকায় ঝুঁকি এড়িয়ে চলা এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি।
চাম্পি তাইওয়ান থেকে দূরে সরে যাওয়ায় তাৎক্ষণিক ঝুঁকি কমতে শুরু করলেও ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত এবং স্বাভাবিক জনজীবন ফিরিয়ে আনাই কর্তৃপক্ষের প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
