চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল তিব্বতে শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছেন। রিখটার স্কেলে ৭ মাত্রার এই ভূমিকম্পে আহত হয়েছেন বহু মানুষ এবং ধসে পড়েছে শত শত বাড়িঘর। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে প্রতিকূল আবহাওয়া, যোগাযোগব্যবস্থার ক্ষতি ও পরাঘাতের আশঙ্কার মুখে পড়েছেন উদ্ধারকারীরা।
২২ অক্টোবর স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৩৩ মিনিটের দিকে উত্তর তিব্বতের নাগকু অঞ্চলে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এর কম্পন আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় অনুভূত হয়। অনেক মানুষ আতঙ্কে ঘরবাড়ি ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। কোথাও কোথাও ভবনের দেয়ালে ফাটল দেখা দেয়, আবার কিছু স্থাপনা পুরোপুরি ধসে পড়ে।
ধসে পড়েছে শত শত বাড়িঘর
স্থানীয় প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ভূমিকম্পে অন্তত ৩৩৯টি বাড়ি এবং ২০টি গবাদিপশুর শেড ধসে পড়েছে বা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্গত এলাকার ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলতে থাকায় প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল নাগকু শহরের পূর্ব-উত্তর-পূর্ব দিকে প্রায় ১৯০ কিলোমিটার দূরে, একটি তুলনামূলকভাবে জনবিরল পাহাড়ি এলাকায়। ভূগর্ভের প্রায় ১০ থেকে ১৮ কিলোমিটার গভীরে কম্পনটির উৎপত্তি হয়েছিল বলে বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক পরিমাপে জানানো হয়।
অগভীর ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে ভূপৃষ্ঠে কম্পনের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। ফলে প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত ঘরবাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তিব্বতের এই ভূমিকম্পেও বহু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
উদ্ধার অভিযানে এক হাজারের বেশি কর্মী
দুর্যোগের পরপরই উদ্ধার অভিযান শুরু করেন স্থানীয় জরুরি বিভাগের কর্মীরা। ধসে পড়া বাড়ির ধ্বংসস্তূপে কেউ আটকে আছেন কি না, তা খুঁজে দেখতে বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি চালানো হয়। আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
উদ্ধারকাজে স্থানীয় পর্যায়ের এক হাজার ছয় শতাধিক কর্মী ও সংশ্লিষ্ট সদস্যকে মোতায়েন করা হয়েছে বলে প্রাথমিক প্রতিবেদনে জানানো হয়। দুর্গত মানুষের জন্য তাঁবু, ভাঁজ করা খাট, শীতের পোশাক, আলো জ্বালানোর সরঞ্জাম এবং অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
ভূমিকম্পের পর একাধিক পরাঘাত বা আফটারশক অনুভূত হওয়ায় উদ্ধারকারীদের সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে। মূল কম্পনের পর ভূগর্ভে সৃষ্ট চাপের পুনর্বিন্যাসের কারণে এ ধরনের কম্পন হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে পরাঘাতের ফলে নতুন করে ধস নামার আশঙ্কাও থাকে।
প্রতিকূল আবহাওয়া উদ্ধারকাজকে কঠিন করছে
তিব্বতের নাগকু অঞ্চল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উঁচুতে অবস্থিত। সেখানে আবহাওয়া সাধারণত শীতল এবং দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে জরুরি সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হতে পারে। ভূমিকম্পের পর তাপমাত্রা কমে যাওয়ার পাশাপাশি তুষারপাতের আশঙ্কা উদ্ধার অভিযানে বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
দুর্গত এলাকার কিছু অংশে যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কোথাও বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ পরিষেবায় বিঘ্ন ঘটেছে। আবার পাহাড় থেকে পাথর গড়িয়ে পড়া ও ভূমিধসের কারণে একটি জাতীয় মহাসড়কের অংশে যান চলাচল সীমিত করা হয়েছে। জরুরি উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে নিয়োজিত যানবাহনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে দুর্গত এলাকার মানুষের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে দ্রুত তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই উদ্ধারকারীদের পাশাপাশি প্রশাসনের জন্যও সঠিক তথ্য সংগ্রহ এবং ত্রাণ বিতরণ সমন্বয় করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জরুরি সহায়তার নির্দেশ চীনা প্রেসিডেন্টের
ভূমিকম্পের পর চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং দুর্গত এলাকায় উদ্ধার অভিযান জোরদার এবং আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নিরাপত্তা, আশ্রয় এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
কর্তৃপক্ষকে সম্ভাব্য পরাঘাত ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের ওপর নজর রাখার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। দুর্যোগের পর জরুরি আশ্রয়, খাদ্য, উষ্ণ পোশাক ও চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে নতুন উদ্বেগ
তিব্বত ও আশপাশের অঞ্চল ভূতাত্ত্বিকভাবে সক্রিয় এলাকায় অবস্থিত। ভারতীয় ও ইউরেশীয় ভূত্বকীয় পাতের পারস্পরিক গতিবিধির কারণে হিমালয় অঞ্চলে ভূমিকম্পের ঝুঁকি রয়েছে। এ কারণে ভবন নির্মাণে ভূমিকম্প সহনশীল নকশা, জরুরি আশ্রয়ের ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান দুর্যোগে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পরিবর্তিত হতে পারে। ধসে পড়া বাড়িঘরে আটকে পড়া মানুষকে খুঁজে বের করা, আহতদের চিকিৎসা দেওয়া এবং গৃহহীন পরিবারগুলোর জন্য নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।
দুর্গম পরিবেশ ও শীতল আবহাওয়ার মধ্যে উদ্ধারকারীদের দ্রুত পদক্ষেপ দুর্গত মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগের ক্ষতি কমাতে ভূমিকম্প সহনশীল অবকাঠামো এবং কার্যকর জরুরি প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তাও আবার সামনে এসেছে।
