ভেনেজুয়েলার রাজনীতিতে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে ২০২৭ সালের সম্ভাব্য নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন করে সক্রিয় হচ্ছে বিরোধী শিবির। নির্বাসন ও রাজনৈতিক চাপের মুখে থাকা বিরোধী নেতাদের একাংশ ভোটারদের সংগঠিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। দেশের বাইরে থাকা লাখ লাখ ভেনেজুয়েলান নাগরিককে ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের আওতায় আনার পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ বলছেন, নির্বাচনের আগে বিচার বিভাগ ও নির্বাচনব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। ফলে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হলেও ভোটের নির্দিষ্ট তারিখ এখনো অনিশ্চিত।
ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক সংকট নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে চলতি বছরের জানুয়ারিতে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আটক হওয়ার পর দেশটির ক্ষমতার কাঠামোয় বড় পরিবর্তন ঘটে। দেলসি রদ্রিগেজ অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাঁর সরকারের যোগাযোগ ও সমঝোতার উদ্যোগ চললেও বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক বন্দিদের অবস্থা এবং নির্বাচনব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
ভোটের প্রস্তুতিতে বিরোধীদের নতুন উদ্যোগ
বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ মারিয়া কোরিনা মাচাদোর নেতৃত্বাধীন ‘ভেন্তে ভেনেজুয়েলা’ আন্দোলন দেশের বাইরে বসবাসরত নাগরিকদের ভোটার নিবন্ধনের তথ্য সংগ্রহে একটি ডিজিটাল উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন অ্যাপের মাধ্যমে বিদেশে থাকা ভেনেজুয়েলানদের পরিচয় ও নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে নির্বাচন কর্তৃপক্ষ সংস্কার হলে এসব তথ্য সরকারি ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।
এই উদ্যোগের গুরুত্ব অনেক বেশি। অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাজনিত কারণে গত কয়েক বছরে বিপুলসংখ্যক ভেনেজুয়েলান দেশ ছেড়েছেন। বিদেশে বসবাসরত নাগরিকদের একটি বড় অংশ তরুণ। তাঁদের অনেকেই দেশের বাইরে যাওয়ার পর কখনো ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি। বিরোধীদের ধারণা, এই জনগোষ্ঠীকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা গেলে ভবিষ্যতের ভোটে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তবে অ্যাপের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করলেই কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরকারি ভোটার তালিকায় যুক্ত হবেন না। নির্বাচন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, নিবন্ধনব্যবস্থার সংস্কার এবং বিদেশে ভোট দেওয়ার বাস্তব সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। এসব শর্ত পূরণ না হলে উদ্যোগটি রাজনৈতিক সংগঠনের কাজে সহায়ক হলেও আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারবে না।
মাচাদোর প্রত্যাবর্তন ও বিরোধী রাজনীতির হিসাব
মাচাদো দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বিরোধী শিবিরের কর্মকাণ্ডকে জটিল করে তুলেছিল। তবে অক্টোবরের শেষ দিকে তিনি ভেনেজুয়েলায় ফিরে আসার পর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। দেশে তাঁর প্রত্যাবর্তন বিরোধী সমর্থকদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বিরোধী পক্ষের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রশ্নও সামনে এসেছে।
বিরোধী শিবিরের দাবি, ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে তাদের প্রার্থী এদমুন্দো গঞ্জালেস উরুতিয়া জয়ী হয়েছিলেন। মাদুরো সরকার সেই ফল প্রত্যাখ্যান করেছিল। বিরোধীদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশও ওই নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও ফল প্রকাশের পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন। ফলে নতুন নির্বাচন আয়োজনের আগে আগের নির্বাচনের বিতর্ক, রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অধিকার এবং নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সমাধান প্রয়োজন।
মাচাদোর অনুপস্থিতিতে বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব ও কৌশল নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। তাঁর প্রত্যাবর্তন সেই নেতৃত্বকে পুনরায় দৃশ্যমান করেছে। কিন্তু বিরোধী দলগুলোর মধ্যে কৌশলগত ঐক্য কতটা থাকবে, সরকারপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় তারা কতটা প্রভাব রাখতে পারবে এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের পরিবেশ কতটা উন্মুক্ত হবে—এসব বিষয় এখনো অনির্ধারিত।
নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগ সংস্কারের প্রশ্ন
ভেনেজুয়েলায় গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থার সংকট। বিরোধী দল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের অভিযোগ, সুপ্রিম কোর্ট এবং জাতীয় নির্বাচন পরিষদ সরকারের প্রভাবমুক্ত নয়। তাই নতুন ভোটের আগে বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কর্তৃপক্ষের কাঠামোগত সংস্কারের দাবি উঠেছে।
দেশটির সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এবং নির্বাচন পরিষদের সদস্যদের পরিবর্তন বা পুনর্গঠনের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। কিন্তু এ ধরনের সংস্কার শুধু পদে নতুন ব্যক্তিদের নিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। নিয়োগপ্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ, রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ কতটা নিশ্চিত এবং ভোট গণনা ও ফল প্রকাশের ব্যবস্থা কতটা নিরপেক্ষ—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, অবিলম্বে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হবে না। তাঁর মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া দ্রুত ভোট আয়োজন করলে নতুন সংঘাত তৈরি হতে পারে। তিনি এমন একটি নির্বাচন কর্তৃপক্ষ গঠনের কথা বলেছেন, যাকে রাজনৈতিক পক্ষগুলো গ্রহণযোগ্য মনে করবে। তবে বিরোধীদের আশঙ্কা, সংস্কারের নামে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ও তেলের রাজনীতি
ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ নির্বাচনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। দেশটির বিপুল তেলসম্পদ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াশিংটন একদিকে রাজনৈতিক রূপান্তর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কথা বলছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জ্বালানি খাতে কার্যক্রম স্বাভাবিক করার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের জন্য ভেনেজুয়েলার বর্তমান নির্বাচনী অবকাঠামো পরিবর্তন করা প্রয়োজন। বিচার বিভাগ, নির্বাচন পরিষদ, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়গুলোও তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার নিয়ে বিরোধী শিবিরের একাংশের সংশয় রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, তেল ও বিনিয়োগসংক্রান্ত সমঝোতা রাজনৈতিক সংস্কারের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেতে পারে।
২০২৭ সাল কি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য?
মাচাদো ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে অবস্থান জানিয়েছেন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার এখনো কোনো নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করেনি। নির্বাচন পরিষদ পুনর্গঠন, ভোটার তালিকা হালনাগাদ, বিদেশে থাকা নাগরিকদের ভোটাধিকার, রাজনৈতিক বন্দিদের পরিস্থিতি এবং সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সময় লাগবে।
এ ছাড়া অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা, নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল করা এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে ন্যূনতম আস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়ও রয়েছে। তাই ২০২৭ সালের নির্বাচন কেবল একটি ভোটের আয়োজন নয়; এটি ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠার বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
