পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে মায়ের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারেননি কিম আরিস। দূরদেশে বসে মিয়ানমারের সাবেক নেত্রী অং সান সু চির খবর জানার জন্য অপেক্ষা করেছেন তিনি। অবশেষে সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হলো। ২২ অক্টোবর টেলিফোনে মায়ের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন যুক্তরাজ্যে বসবাসরত কিম আরিস। তবে বহু প্রতীক্ষিত এই যোগাযোগের পরও মায়ের মুক্তি এবং তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি ছেলের।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। ওই সময় অং সান সু চিসহ দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের আটক করা হয়। এরপর থেকে তাঁকে প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রাখা হয়েছিল। দীর্ঘ সময় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ না পাওয়ায় তাঁর স্বাস্থ্য ও অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
২০ মিনিটের ফোনালাপে ফিরল মায়ের কণ্ঠ
মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোতে গৃহবন্দি অবস্থায় থাকা সু চির সঙ্গে লন্ডনে অবস্থিত মিয়ানমারের দূতাবাসের মাধ্যমে কথা বলেন তাঁর ছেলে। দেশটির প্রেসিডেন্টের মুখপাত্রের তথ্য অনুযায়ী, ফোনালাপটি প্রায় ২০ মিনিট স্থায়ী হয়।
কিম আরিস জানান, পাঁচ বছরেরও বেশি সময় পর মায়ের কণ্ঠ শুনতে পারা তাঁর কাছে ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার পর এই কথোপকথন তাঁকে স্বস্তি দিলেও একে স্বাভাবিক পারিবারিক যোগাযোগের বিকল্প হিসেবে দেখছেন না তিনি।
ফোনালাপের সময় মা-ছেলের মধ্যে পরিবারের খবরাখবর এবং গত কয়েক বছরে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে বলে জানা গেছে। আরিসের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর মা প্রথমেই তাঁর স্বাস্থ্যের খোঁজ নেন। এই ছোট্ট মুহূর্তটি দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতার মধ্যে পারিবারিক সম্পর্কের গভীরতাকেই সামনে এনেছে।
কেন এত দিন যোগাযোগ করতে পারেননি ছেলে?
অং সান সু চি মিয়ানমারের রাজনীতিতে কয়েক দশক ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ১৯৯১ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। ২০১৫ সালের নির্বাচনে তাঁর দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি বড় জয় পায় এবং পরবর্তী সময়ে তিনি দেশটির কার্যত বেসামরিক নেতৃত্বের কেন্দ্রে অবস্থান করেন।
কিন্তু ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থান তাঁর রাজনৈতিক জীবনে বড় পরিবর্তন আনে। সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের পর তাঁকে বিভিন্ন অভিযোগে আটক করে। পরবর্তী সময়ে একাধিক মামলায় তাঁর সাজা ঘোষণা করা হয়। সু চি ও তাঁর সমর্থকেরা এসব মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন।
সামরিক শাসনের অধীনে তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। যুক্তরাজ্যে বসবাসরত কিম আরিস দীর্ঘদিন ধরে মায়ের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ এবং তাঁর অবস্থার নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
গৃহবন্দি হলেও মুক্ত নন সু চি
২০২৬ সালের এপ্রিলে সু চিকে কারাগার থেকে গৃহবন্দি অবস্থায় স্থানান্তর করা হয়েছে বলে মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ জানায়। পরবর্তী সময়ে তাঁর কয়েকটি ছবি প্রকাশ করা হয়। তবে স্থান পরিবর্তন বা সীমিত যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হওয়া মানেই তিনি স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছেন, এমন নয়।
আরিসের বক্তব্য, একটি ফোনালাপকে নিয়মিত পারিবারিক যোগাযোগ হিসেবে দেখা যাবে না। তাঁর মা এখনো আটক রয়েছেন এবং স্বাধীনভাবে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। তিনি সু চির অবিলম্বে ও নিঃশর্ত মুক্তির পাশাপাশি অন্য রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তিরও দাবি জানিয়েছেন।
সু চির বয়স এখন ৮১ বছর। এই বয়সে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকার কারণে তাঁর শারীরিক সুস্থতা নিয়ে পরিবারের উদ্বেগ রয়েছে। আরিস ফোনালাপের পর মাকে তুলনামূলকভাবে সুস্থ ও মানসিকভাবে দৃঢ় মনে হয়েছে বলে জানিয়েছেন। তবে তাঁর প্রকৃত শারীরিক অবস্থা স্বাধীনভাবে যাচাই করার সুযোগ এখনো সীমিত।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন প্রশ্ন
সু চির সঙ্গে ছেলের ফোনালাপের ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটেছে, যখন মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। দেশটিতে সামরিক অভ্যুত্থানের পর সংঘাত, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারবিরোধী গোষ্ঠী ও সামরিক বাহিনীর সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সু চির কয়েকটি ছবি প্রকাশ এবং তাঁকে সীমিত যোগাযোগের সুযোগ দেওয়াকে কেউ কেউ আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলার কৌশল হিসেবে দেখছেন। তবে একটি ফোনালাপ থেকে সামরিক সরকারের নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন এসেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
কিম আরিসও সতর্ক করেছেন, তাঁর মাকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা কিংবা রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
একটি ফোনালাপ, কিন্তু মুক্তির অপেক্ষা শেষ হয়নি
দীর্ঘ পাঁচ বছর পর মায়ের কণ্ঠ শুনতে পাওয়া কিম আরিসের জন্য নিঃসন্দেহে আবেগঘন মুহূর্ত। কিন্তু এই ঘটনা মিয়ানমারের রাজনৈতিক সংকটের সমাধান নয়। সু চির মুক্তি, পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং তাঁর স্বাস্থ্য সম্পর্কে স্বাধীনভাবে তথ্য পাওয়ার সুযোগ এখনো গুরুত্বপূর্ণ দাবি হিসেবে রয়ে গেছে।
এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজর থাকবে, এই সীমিত যোগাযোগের পর সু চির সঙ্গে পরিবারের নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয় কি না এবং রাজনৈতিক বন্দিদের বিষয়ে মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ কোনো পরিবর্তন আনে কি না। আপাতত বহু প্রতীক্ষিত ফোনালাপ স্বস্তি এনে দিলেও মুক্তির অপেক্ষা শেষ হয়নি।
