ইন্দোনেশিয়ার বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল ও পিটভূমিতে জ্বলতে থাকা দাবানলের ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ। মাসের পর মাস ধরে চলা আগুনের কারণে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে বিপজ্জনক দূষণ। ইন্দোনেশিয়ায় শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়েছে। ধোঁয়ার প্রভাবে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরেও বায়ুর মান বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। কোথাও স্কুল বন্ধ রাখতে হয়েছে, কোথাও ব্যাহত হয়েছে বিমান চলাচল। পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাজার হাজার অগ্নিনির্বাপণকর্মী কাজ করলেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি দাবানল।
অক্টোবরের শেষ দিকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ার সাতটি প্রদেশে দাবানল ও ভূমিতে আগুন লাগার ঘটনায় সৃষ্ট ধোঁয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের সংখ্যা ৩ লাখ ৩৩ হাজার ছাড়িয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, আগস্টের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এই সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েছে।
কোথা থেকে ছড়াচ্ছে বিষাক্ত ধোঁয়া?
দাবানলের প্রধান উৎস ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা ও বোর্নিও দ্বীপের বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল এবং পিটভূমি। পিটভূমি হলো মাটির নিচে আংশিক পচে জমে থাকা জৈব পদার্থসমৃদ্ধ এলাকা, যেখানে আগুন লাগলে তা দীর্ঘ সময় ধরে মাটির নিচেও জ্বলতে পারে।
শুষ্ক মৌসুমে এসব অঞ্চলে আগুন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে কৃষিজমি তৈরি, বন পরিষ্কার এবং জমির ব্যবহার পরিবর্তনের জন্য কোথাও কোথাও আগুন ব্যবহার করা হয়। একবার আগুন ছড়িয়ে পড়লে শুকনো উদ্ভিদ, জৈব পদার্থ ও পিটের স্তর দীর্ঘ সময় ধরে জ্বলতে থাকে।
এ বছর তীব্র গরম ও দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক আবহাওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের আবহাওয়ায় পরিবর্তন এসেছে। অনেক এলাকায় বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় বন ও পিটভূমি আরও শুকিয়ে গেছে। ফলে আগুন নেভানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিন লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত
দাবানলের ধোঁয়ায় থাকা সূক্ষ্ম কণা মানুষের ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ করে পিএম২.৫ নামে পরিচিত অতি সূক্ষ্ম বায়ুদূষণকারী কণা শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে এবং আগে থেকে থাকা শ্বাসকষ্ট ও হৃদ্রোগের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে।
ইন্দোনেশিয়ার সাতটি প্রদেশে কয়েক মাসে তিন লাখের বেশি তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং আগে থেকে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় ভোগা মানুষের ঝুঁকি বেশি।
তবে নথিভুক্ত সংক্রমণের সব ঘটনাকে শুধু দাবানলের ধোঁয়ার কারণে হয়েছে বলে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। কিন্তু ধোঁয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত দূষণ এবং শ্বাসতন্ত্রের অসুস্থতার বৃদ্ধি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে।
দূষণ মোকাবিলায় স্বাস্থ্যকর্মী মোতায়েন, মাস্ক বিতরণ এবং চিকিৎসাসেবা জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনকে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা পর্যবেক্ষণ এবং জরুরি চিকিৎসার প্রস্তুতি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরেও বিপজ্জনক পরিস্থিতি
ইন্দোনেশিয়ার দাবানলের ধোঁয়া বাতাসের সঙ্গে সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে। মালয়েশিয়ার সারাওয়াক রাজ্যের কিছু এলাকায় বায়ুদূষণ এতটাই বেড়েছে যে জরুরি ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। কয়েকটি স্থানে স্কুল বন্ধ রাখা এবং বাইরের কার্যক্রম সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সিঙ্গাপুরেও ধোঁয়ার কারণে বায়ুর মান উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ হয়েছে। কিছু এলাকায় সূক্ষ্ম দূষণকারী কণার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় জনসাধারণকে বাইরে দীর্ঘ সময় অবস্থান না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আন্তসীমান্ত ধোঁয়াদূষণ নতুন সমস্যা নয়। অতীতেও ইন্দোনেশিয়ার বন ও পিটভূমির আগুন থেকে সৃষ্ট ধোঁয়া প্রতিবেশী দেশগুলোর জনজীবন ব্যাহত করেছে। তবে এ বছরের দীর্ঘস্থায়ী দাবানল পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে।
স্কুল বন্ধ, বিমান চলাচলেও প্রভাব
ধোঁয়ার কারণে বিভিন্ন এলাকায় দৃশ্যমানতা কমে গেছে। ইন্দোনেশিয়ার কিছু অঞ্চলে স্কুলের পাঠদান অনলাইনে স্থানান্তর করতে হয়েছে। শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে বাইরে খেলাধুলা ও অন্যান্য কার্যক্রম সীমিত করা হয়েছে।
বিমান চলাচলেও এর প্রভাব পড়েছে। ধোঁয়ায় দৃশ্যমানতা কমে গেলে উড়োজাহাজ ওঠানামা এবং বিমানবন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ায় বহু ফ্লাইট বাতিল বা পরিবর্তন করতে হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এ ধরনের পরিস্থিতি শুধু যাত্রীদের ভ্রমণেই প্রভাব ফেলে না; পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং পণ্য পরিবহনেও অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি করে।
আগুন নেভাতে হাজার হাজার কর্মী
ইন্দোনেশিয়ার সরকার দাবানল মোকাবিলায় ব্যাপক জনবল ও সরঞ্জাম মোতায়েন করেছে। ৬০ হাজারের বেশি কর্মীকে আগুন নেভানো, নজরদারি এবং পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি উড়োজাহাজ ও হেলিকপ্টারের মাধ্যমে পানি ছিটানো এবং কৃত্রিম বৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কিছু এলাকায় আগুনের কেন্দ্রের সংখ্যা কমলেও পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। পিটভূমির আগুন মাটির নিচে দীর্ঘ সময় ধরে জ্বলতে পারে। ফলে ওপরের আগুন নিভে গেলেও পরে আবার তা জ্বলে ওঠার আশঙ্কা থাকে।
সরকার সন্দেহভাজন জমি পোড়ানোর ঘটনা তদন্ত এবং দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগও নিয়েছে। তবে বন ব্যবস্থাপনা, কৃষিজমি তৈরির পদ্ধতি এবং আগুন প্রতিরোধের কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে আরও কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে।
বৃষ্টি এলেই কি সংকট কাটবে?
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক এলাকায় বর্ষাকালের বৃষ্টি শুরু হলে দাবানলের তীব্রতা কমতে পারে। কিন্তু বৃষ্টিপাতের সময় ও পরিমাণ অনিশ্চিত থাকায় দ্রুত স্বস্তি ফিরে আসবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগুন নেভানোর পাশাপাশি বন ও পিটভূমি সংরক্ষণ, আগাম সতর্কতা, জমি পরিষ্কারে আগুন ব্যবহারের প্রবণতা কমানো এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি।
এই সংকটের প্রভাব শুধু ইন্দোনেশিয়ায় সীমাবদ্ধ নেই। বাতাসের সঙ্গে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ায় পুরো অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই দাবানল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
