বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে টানা শ্রমিক বিক্ষোভের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সময়সূচি ঘোষণা করেছে সরকার গঠিত নিম্নতম মজুরি বোর্ড। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে পোশাক শ্রমিকদের জন্য নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর হবে। ডিসেম্বর মাসের বর্ধিত বেতন শ্রমিকেরা পাবেন ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে। তবে নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন বেতন কত টাকা নির্ধারণ করা হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বুধবার (৪ নভেম্বর) মজুরি বোর্ডের প্রথম বৈঠকে মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা এই সময়সূচিতে একমত হয়েছেন।
এদিকে নতুন সিদ্ধান্তের পরও রাজধানীর মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ পুরোপুরি থামেনি। টানা পঞ্চম দিনের মতো বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। শ্রমিকদের প্রধান দাবি, বর্তমান ১২ হাজার ৫০০ টাকার ন্যূনতম মাসিক মজুরি বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করা। পাশাপাশি অন্যায়ভাবে শ্রমিক ছাঁটাই, কালো তালিকাভুক্তি এবং বকেয়া বেতন পরিশোধ নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে তাদের।
সরকারের নতুন ঘোষণা শ্রমিকদের দাবির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও বেতন কত বাড়বে, তা নির্ধারণ না হওয়ায় আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
সরকার ও মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধিদের সিদ্ধান্ত কী?
শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনে ১ নভেম্বর ছয় সদস্যের নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার। এর তিন দিনের মাথায় ৪ নভেম্বর বোর্ডের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকরের সময় নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছান।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হবে ১ ডিসেম্বর ২০২৬ থেকে। অর্থাৎ ডিসেম্বর মাস থেকেই শ্রমিকদের নতুন নির্ধারিত বেতন হিসাব করা হবে। সেই মাসের বর্ধিত বেতন দেওয়া হবে ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে।
বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আখতার জানিয়েছেন, নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের বিষয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছে এবং ডিসেম্বরের মধ্যেই বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি এবিএম সামছুদ্দিনও জানিয়েছেন, নতুন কাঠামো নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের সময়সূচি নিয়ে দুই পক্ষ একমত।
বোর্ডের পরবর্তী বৈঠক আগামী সপ্তাহে হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে শ্রমিক ও মালিকপক্ষ নিজেদের লিখিত প্রস্তাব উপস্থাপন করবে। এরপর দুই পক্ষের দাবি, শিল্পের আর্থিক সক্ষমতা এবং শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনা করে নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের আলোচনা এগোবে।
নতুন বেতন কত হবে, ৩০ হাজার টাকার দাবি কি পূরণ হচ্ছে?
এখন পর্যন্ত নতুন বেতনের নির্দিষ্ট অঙ্ক ঘোষণা করা হয়নি। শ্রমিকদের দাবি, পোশাকশ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। অর্থাৎ বর্তমান ন্যূনতম মজুরির তুলনায় প্রায় ১৪০ শতাংশ বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন তারা।
শ্রমিকদের যুক্তি, গত কয়েক বছরে খাদ্যপণ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, পরিবহন ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অনেক বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে তাদের আয় বাড়েনি। ফলে বর্তমান বেতনে ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে পরিবার নিয়ে বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে পোশাকশিল্পের মালিকেরা উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানির মূল্য, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা এবং ক্রয়াদেশের অনিশ্চয়তার বিষয়টি সামনে আনছেন। তাদের মতে, শিল্পের সক্ষমতা বিবেচনা না করে অতিরিক্ত বেতন বাড়ালে অনেক কারখানা আর্থিক চাপে পড়তে পারে।
তাই ৩০ হাজার টাকার দাবি শেষ পর্যন্ত কতটা পূরণ হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। মজুরি বোর্ডের আলোচনা ও চূড়ান্ত সুপারিশের পরই নতুন বেতনের প্রকৃত অঙ্ক জানা যাবে।
বিক্ষোভ থামাতে সরকারের আরও যেসব উদ্যোগ
শ্রমিক অসন্তোষের শুরুতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
1. ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন: ১ নভেম্বর পোশাকশ্রমিকদের নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বোর্ডে শ্রমিক, মালিক ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
2. দ্রুত মজুরি নির্ধারণের উদ্যোগ: সাধারণত কোনো শিল্প খাতের নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে ছয় মাস পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত সুপারিশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
3. বকেয়া বেতন পরিশোধ: শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধ এবং প্রতি মাসের ৭ তারিখের মধ্যে নিয়মিত বেতন দেওয়ার বিষয়টি মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় তোলা হয়েছে।
4. কারখানা চালু রাখার উদ্যোগ: শ্রম অসন্তোষের কারণে কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সরকার মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। সরকারের অনুরোধে ৪ নভেম্বর কারখানা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মালিকেরা। তবে কোনো কারখানায় সহিংসতা বা শ্রমিকদের কাজে না ফেরার পরিস্থিতি তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট মালিক নিজস্ব সিদ্ধান্তে কারখানা বন্ধ করতে পারবেন।
5. শ্রমিক অধিকার নিয়ে আলোচনা: নতুন মজুরি নির্ধারণের পাশাপাশি ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার, ছুটি, কর্মক্ষেত্রের সুযোগ-সুবিধা এবং শ্রম আইন বাস্তবায়নের বিষয়গুলোও বোর্ডের আলোচনায় এসেছে।
বোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ আজাদ সুবহানি জানিয়েছেন, শ্রমিকদের প্রত্যাশা ও শিল্পের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সুপারিশ তৈরির চেষ্টা করা হবে।
আজও কেন বিক্ষোভ করছেন শ্রমিকেরা?
৪ নভেম্বর বুধবারও সাভারের হেমায়েতপুর, আশুলিয়া, গাজীপুর ও রাজধানীর মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ হয়েছে। সাভারের পদ্মার মোড় এলাকায় শ্রমিকেরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। কয়েক দফায় পুলিশ ও শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়।
শ্রমিকদের অসন্তোষের অন্যতম কারণ, নতুন বেতন কাঠামোর সময়সূচি ঘোষণা হলেও বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ এখনো নির্ধারিত হয়নি। তাদের আশঙ্কা, আলোচনার নামে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে আবারও দাবি বাস্তবায়ন পিছিয়ে যেতে পারে।
এ ছাড়া কালো তালিকাভুক্তির মাধ্যমে আন্দোলনকারী শ্রমিকদের চাকরির সুযোগ বন্ধ করা, অন্যায়ভাবে ছাঁটাই এবং শ্রমিক নেতাদের হয়রানির অভিযোগও আন্দোলনে গুরুত্ব পাচ্ছে। শ্রমিক প্রতিনিধিরা আটক শ্রমিক ও নেতাদের মুক্তি এবং শ্রমিকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক ব্যবস্থা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।
কতটা ক্ষতির মুখে পোশাকশিল্প?
শ্রমিক অসন্তোষের প্রভাব পড়েছে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে। আন্দোলনের কারণে বিভিন্ন সময়ে শত শত কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। ১ নভেম্বর প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, এর আগে ৫২৯টি কারখানা বন্ধ হয়েছিল এবং প্রায় ৯ লাখ ৮৭ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছিলেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি এই পোশাকশিল্প। প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে এ খাতে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী শ্রমিক অসন্তোষ শুধু শ্রমিক ও মালিকদের নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হলে ক্রয়াদেশের পণ্য নির্ধারিত সময়ে পাঠানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এতে ভবিষ্যতে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা এবং নতুন ক্রয়াদেশ পাওয়ার ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, কবে বাড়তি বেতন পাবেন শ্রমিকেরা?
এখন পর্যন্ত পাওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী সপ্তাহে মজুরি বোর্ডের পরবর্তী বৈঠক হওয়ার কথা। সেখানে মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা নিজেদের প্রস্তাব জমা দেবেন। ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
সময়সূচিটি হলো:
- ১ নভেম্বর ২০২৬: ছয় সদস্যের নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন।
- ৪ নভেম্বর ২০২৬: বোর্ডের প্রথম বৈঠক ও বাস্তবায়নের সময় নিয়ে ঐকমত্য।
- নভেম্বর ২০২৬: মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রস্তাব এবং মজুরি নির্ধারণের আলোচনা।
- ডিসেম্বর ২০২৬: নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের নির্ধারিত সময়।
- জানুয়ারি ২০২৭: ডিসেম্বর মাসের নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন পাওয়ার কথা।
অর্থাৎ শ্রমিকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ১ ডিসেম্বর থেকে নতুন মজুরি কার্যকর হলেও বর্ধিত বেতন হাতে আসবে ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে।
সব মিলিয়ে সরকারের উদ্যোগে নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নের একটি সময়সীমা নির্ধারিত হয়েছে। তবে শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকার দাবি পূরণ হবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। নতুন বেতনের অঙ্ক, বকেয়া পরিশোধ এবং শ্রমিকদের অন্যান্য অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
