যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে বিশালাকৃতির বিজয়তোরণ নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দীর্ঘ বিতর্ক, আইনি চ্যালেঞ্জ এবং ব্যাপক সমালোচনার পর প্রকল্পটি নির্মাণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ফেডারেল অনুমোদনও পেয়ে যায়। কিন্তু সেই অনুমোদনের আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। চূড়ান্ত অনুমোদনের এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির একটি ফেডারেল আদালত। ফলে ট্রাম্পের বহুল আলোচিত এই স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
প্রস্তাবিত স্থাপনাটির উচ্চতা হবে প্রায় ২৫০ ফুট। ওয়াশিংটনের লিংকন মেমোরিয়াল এবং আর্লিংটন ন্যাশনাল সিমেট্রির সংযোগকারী এলাকার কাছে মেমোরিয়াল সার্কেলে এটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, স্থাপনাটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি, জাতীয় ঐক্য, ইতিহাস ও দেশপ্রেমের প্রতীক হিসেবে কাজ করবে। তবে সমালোচকদের মতে, এটি মূলত ট্রাম্পের ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে স্থায়ী করার একটি উদ্যোগ।
অনুমোদনের পরপরই আদালতের নিষেধাজ্ঞা
৫ নভেম্বর দীর্ঘ শুনানি শেষে ন্যাশনাল ক্যাপিটাল প্ল্যানিং কমিশন ৮-৪ ভোটে প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। প্রায় আট ঘণ্টার শুনানিতে শতাধিক মানুষ তাঁদের মতামত তুলে ধরেন। তাঁদের বড় একটি অংশ ছিলেন সাবেক সেনাসদস্য, স্থানীয় বাসিন্দা, ইতিহাস সংরক্ষণকর্মী ও জনপ্রতিনিধি। তাঁদের অনেকেই প্রকল্পটির বিরোধিতা করেন।
কমিশনের অনুমোদনের পরপরই নির্মাণকাজ শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল ট্রাম্প প্রশাসন। কিন্তু এর মধ্যেই ওয়াশিংটন ডিসি ও ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ফেডারেল জেলা আদালতের বিচারক তানিয়া চুটকান নির্মাণকাজে ১৪ দিনের অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
বিচারকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, নির্মাণকাজ শুরু হলে স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের ওপর তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে যানজট, জরুরি সেবার চলাচল এবং স্থানীয় সংস্থাগুলোর আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এসব ক্ষতি এড়ানো কঠিন হতে পারে বলেও আদালত মনে করেন।
কেন বিতর্কের কেন্দ্রে ২৫০ ফুটের এই স্থাপনা?
ট্রাম্পের পরিকল্পিত বিজয়তোরণটি আকারের দিক থেকে অত্যন্ত বিশাল। প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এটি নির্মিত হলে ওয়াশিংটনের অন্যতম দৃশ্যমান স্থাপনায় পরিণত হবে। লিংকন মেমোরিয়াল ও আর্লিংটন ন্যাশনাল সিমেট্রির কাছাকাছি অবস্থানের কারণে এর নকশা, উচ্চতা এবং ঐতিহাসিক পরিবেশের ওপর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সাবেক সদস্যদের একটি অংশ মনে করছেন, আর্লিংটন ন্যাশনাল সিমেট্রির মতো গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিবিজড়িত স্থানের পাশে এত বড় স্থাপনা নির্মাণ করা অনুচিত। সেখানে সমাহিত সেনাসদস্যদের স্মৃতির প্রতি যথাযথ সম্মান বজায় রাখার বিষয়টিও তাঁরা সামনে এনেছেন।
সমালোচকদের আরেকটি অভিযোগ হলো, প্রকল্পটির জন্য প্রয়োজনীয় কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। তাঁদের মতে, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক এলাকায় এত বড় স্থাপনা নির্মাণের সিদ্ধান্ত শুধু প্রশাসনিক অনুমোদনের মাধ্যমে নেওয়া যায় না।
পুরোনো আইনের ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন
ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি, ১৯২৫ সালের একটি আইনের মাধ্যমে এই এলাকায় স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। সেই পুরোনো আইনে আর্লিংটন মেমোরিয়াল ব্রিজের কাছে দুটি বিশাল স্তম্ভ নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। প্রশাসন মনে করছে, ওই আইনের ভিত্তিতেই বর্তমান বিজয়তোরণ নির্মাণের আইনি সুযোগ রয়েছে।
তবে বিচারক চুটকান এই যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এক শতাব্দী আগের একটি আইনের মাধ্যমে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ২৫০ ফুট উঁচু বিজয়তোরণ নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল—এমন ব্যাখ্যা গ্রহণ করা কঠিন। কারণ, পুরোনো পরিকল্পনায় দুটি স্তম্ভের কথা বলা হয়েছিল, বর্তমান নকশার বিশাল তোরণের কথা নয়।
এ ছাড়া প্রকল্পটির পরিবেশগত ও ঐতিহাসিক প্রভাব নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিসের এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, স্থাপনাটি আশপাশের ৪২টি ঐতিহাসিক স্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর মধ্যে ছয়টি স্থানের ওপর প্রভাবকে সবচেয়ে গুরুতর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নির্মাণকাজে বড় ধরনের প্রস্তুতি ছিল প্রশাসনের
ট্রাম্প প্রশাসন প্রকল্পটি দ্রুত এগিয়ে নিতে চেয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে নির্মাণকাজ চালানোর কথা ছিল। দুই থেকে তিন বছর ধরে প্রায় সার্বক্ষণিক কাজ চলার সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়েছিল।
মার্কিন বিচার বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে ছয় থেকে আট মাস ধরে মাটির নিচের খনন ও ভিত্তি নির্মাণের কাজ হওয়ার কথা ছিল। পুরো প্রকল্প শেষ করতে ৩৩ থেকে ৩৯ মাস সময় লাগতে পারে। অর্থাৎ ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও নির্মাণকাজ চলতে পারত।
এদিকে প্রকল্পটির নকশায় সামরিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত কিছু ব্যবস্থার কথাও উঠে এসেছে। ট্রাম্প একে পর্যটন আকর্ষণের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য জমা দেওয়া নকশায় এসব সামরিক ব্যবস্থার বিস্তারিত ব্যাখ্যা ছিল না বলে শুনানিতে প্রশ্ন ওঠে।
রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের লড়াইয়ে নতুন বাধা
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের অন্যতম আলোচিত উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে এই বিজয়তোরণ প্রকল্পকে। হোয়াইট হাউসের পূর্বাংশে বিশাল বলরুম নির্মাণসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থাপনায় পরিবর্তন আনার পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের স্থাপত্য ও নগরচিত্রে নিজের ছাপ রেখে যেতে চান প্রেসিডেন্ট।
তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। আগামী জানুয়ারিতে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ডেমোক্র্যাটরা প্রকল্পটির বৈধতা, ব্যয় এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আরও কঠোর নজরদারি চালাতে পারেন।
আপাতত আদালতের ১৪ দিনের নিষেধাজ্ঞায় নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। এই সময়ের মধ্যে প্রশাসনকে আদালতের নির্দেশনা মেনে প্রকল্পের অবস্থান সম্পর্কে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। তবে নিষেধাজ্ঞাটিই চূড়ান্ত রায় নয়; প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার ওপর।
সব মিলিয়ে, ফেডারেল কমিশনের অনুমোদন পাওয়ার পরও ট্রাম্পের বিজয়তোরণ নির্মাণের পথ মসৃণ হলো না। বরং প্রকল্পটি এখন আইনি বৈধতা, ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ এবং রাজনৈতিক বিরোধের এক জটিল পরীক্ষার মুখে।
