একটি মাত্র রক্তের নমুনা থেকেই ৫০টিরও বেশি ধরনের ক্যান্সারের সম্ভাব্য সংকেত শনাক্ত করার প্রযুক্তি চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন আশার সৃষ্টি করেছে। এই পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যান্সারের লক্ষণ প্রকাশের আগেই শরীরে রোগের উপস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব হতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে ক্যান্সার শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান গ্রেইল উদ্ভাবিত ‘গ্যালেরি’ নামের এই রক্ত পরীক্ষাটি একাধিক ধরনের ক্যান্সারের প্রাথমিক সংকেত শনাক্ত করার উদ্দেশ্যে তৈরি। সাধারণত স্তন, জরায়ুমুখ বা অন্ত্রের মতো নির্দিষ্ট অঙ্গের ক্যান্সার শনাক্ত করতে আলাদা আলাদা স্ক্রিনিং পদ্ধতি প্রয়োজন হয়। কিন্তু বহুক্যান্সার শনাক্তকরণ পরীক্ষা একই নমুনা থেকে বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের সম্ভাব্য সংকেত খোঁজে।
তবে পরীক্ষাটি নিয়ে আশার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও রয়েছে। ২০২৬ সালে যুক্তরাজ্যে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার মানুষের অংশগ্রহণে পরিচালিত বৃহৎ পরীক্ষার ফলাফল দেখিয়েছে, প্রযুক্তিটি সম্ভাবনাময় হলেও এখনো প্রমাণিত হয়নি যে এটি সামগ্রিকভাবে শেষ পর্যায়ের ক্যান্সার শনাক্তকরণ কমাতে পারে। তাই একে ক্যান্সার নির্ণয়ের নিশ্চিত পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
রক্তের ভেতরে ক্যান্সারের সংকেত খোঁজে যেভাবে
মানুষের শরীরের কোষ স্বাভাবিকভাবেই ভাঙে ও নতুন কোষ তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়ায় কোষের কিছু উপাদান রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে। ক্যান্সার কোষ থেকেও ডিএনএর ক্ষুদ্র অংশ রক্তে আসতে পারে। একে বলা হয় রক্তপ্রবাহে থাকা কোষমুক্ত ডিএনএ।
গ্যালেরির মতো পরীক্ষায় এই ডিএনএর বিশেষ রাসায়নিক পরিবর্তন, বিশেষ করে মিথাইলেশনের ধরন বিশ্লেষণ করা হয়। ক্যান্সার কোষে ডিএনএর কিছু অংশে রাসায়নিক চিহ্নের বিন্যাস স্বাভাবিক কোষের তুলনায় আলাদা হতে পারে। পরীক্ষাটি সেই বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে ক্যান্সারের সম্ভাব্য সংকেত খোঁজে।
কোনো নমুনায় সন্দেহজনক সংকেত পাওয়া গেলে পরীক্ষাটি সম্ভাব্যভাবে শরীরের কোন অঙ্গ বা টিস্যু থেকে সংকেতটি এসেছে, সে সম্পর্কেও ধারণা দিতে পারে। এর ফলে চিকিৎসকেরা পরবর্তী পরীক্ষা নির্ধারণের ক্ষেত্রে কিছু দিকনির্দেশনা পেতে পারেন।
তবে রক্তে এমন সংকেত পাওয়া মানেই নিশ্চিতভাবে ক্যান্সার হয়েছে, তা নয়। আবার কোনো সংকেত না পাওয়া মানেও শরীরে ক্যান্সার নেই—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।
এক পরীক্ষায় ৫০টির বেশি ক্যান্সার শনাক্তের দাবি
গ্যালেরি পরীক্ষাটি ৫০টিরও বেশি ধরনের ক্যান্সারের সঙ্গে সম্পর্কিত সংকেত শনাক্ত করার জন্য তৈরি হয়েছে। এর সম্ভাব্য সুবিধা হলো, এমন কিছু ক্যান্সারের সংকেতও খুঁজে পাওয়া যেতে পারে যেগুলোর জন্য সাধারণ জনগণের মধ্যে নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের প্রচলিত ব্যবস্থা সীমিত।
উদাহরণ হিসেবে অগ্ন্যাশয়, ডিম্বাশয় এবং কিছু বিরল ক্যান্সারের কথা বলা যায়। এসব রোগের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে স্পষ্ট উপসর্গ নাও দেখা দিতে পারে। ফলে অনেক রোগী চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানোর আগেই রোগটি অগ্রসর পর্যায়ে চলে যায়।
একটি রক্ত পরীক্ষা যদি এ ধরনের ক্যান্সারের সম্ভাব্য সংকেত আগেভাগে শনাক্ত করতে পারে, তাহলে রোগীর আরও পরীক্ষা, চিকিৎসা পরিকল্পনা এবং পর্যবেক্ষণ দ্রুত শুরু করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে ৫০টির বেশি ক্যান্সার শনাক্ত করার সক্ষমতা এবং প্রতিটি ক্যান্সার নির্ভুলভাবে শনাক্ত করার ক্ষমতা এক বিষয় নয়। সব ধরনের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে পরীক্ষাটির কার্যকারিতা সমান নয়। বিশেষ করে রোগের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের বৃহৎ পরীক্ষায় কী জানা গেল
গ্যালেরি পরীক্ষার কার্যকারিতা যাচাই করতে যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত গবেষকেরা একটি বৃহৎ নিয়ন্ত্রিত গবেষণা পরিচালনা করেন। এতে ৫০ থেকে ৭৭ বছর বয়সী প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার মানুষ অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে একদলকে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি গ্যালেরি পরীক্ষা দেওয়া হয়, আর অন্য দল প্রচলিত স্বাস্থ্যসেবা অনুসরণ করে।
২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যায়, পরীক্ষাটি ব্যবহার করা গোষ্ঠীতে চতুর্থ পর্যায়ের ক্যান্সার শনাক্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল। তবে তৃতীয় ও চতুর্থ পর্যায়ের ক্যান্সার একত্রে বিবেচনা করলে সামগ্রিক হ্রাসের প্রধান লক্ষ্যটি অর্জিত হয়নি।
পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে গবেষণার বিস্তারিত ফলাফল বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। এতে দেখা যায়, পরীক্ষাটি কিছু ক্যান্সারের সংকেত শনাক্ত করতে পারলেও সব ক্যান্সার ধরতে পারেনি। গবেষকেরা আরও দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন।
এই ফলাফল থেকে বোঝা যায়, পরীক্ষাটি ক্যান্সার শনাক্তকরণে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যবহার করলে রোগের অগ্রগতি বা মৃত্যুহার কতটা কমবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
ভুল ফলাফলের ঝুঁকি কতটা?
এ ধরনের পরীক্ষায় প্রধানত দুটি ঝুঁকি রয়েছে—ভুল ইতিবাচক ফল এবং ভুল নেতিবাচক ফল। ভুল ইতিবাচক ফলের অর্থ, পরীক্ষায় ক্যান্সারের সংকেত পাওয়া গেলেও পরবর্তী পরীক্ষায় ক্যান্সার নিশ্চিত হলো না। এতে রোগীর উদ্বেগ বাড়তে পারে এবং অতিরিক্ত পরীক্ষা করতে হতে পারে।
অন্যদিকে, ভুল নেতিবাচক ফলের ক্ষেত্রে পরীক্ষায় ক্যান্সারের সংকেত ধরা পড়ে না, যদিও রোগটি শরীরে উপস্থিত থাকে। ফলে কেউ পরীক্ষার ফল স্বাভাবিক দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে গেলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে দেরি হতে পারে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত যুক্তরাজ্যের বৃহৎ গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, গ্যালেরি পরীক্ষার সংবেদনশীলতা সব ধরনের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে সমান ছিল না। পরীক্ষাটি কিছু ক্যান্সারের সংকেত শনাক্ত করতে পারলেও বহু ক্যান্সার শনাক্তের বাইরে থেকে গেছে। তাই নেতিবাচক ফল পেলেও নতুন উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সাধারণ মানুষের জন্য কখন আসবে এই পরীক্ষা?
বহুক্যান্সার শনাক্তকরণ পরীক্ষার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আরও গবেষণা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল্যায়ন, খরচ এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এর ব্যবহারিক সুবিধার ওপর। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের একটি উপদেষ্টা প্যানেল গ্যালেরি পরীক্ষার সম্ভাব্য সুবিধার পক্ষে মত দিলেও পরীক্ষাটির নির্ভুলতা ও প্রাথমিক পর্যায়ের ক্যান্সার শনাক্ত করার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। উপদেষ্টা প্যানেলের মতামত চূড়ান্ত অনুমোদনের সমান নয়।
গবেষকেরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে পরীক্ষাটি প্রচলিত স্ক্রিনিংয়ের পরিপূরক হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে ব্যাপকভাবে ব্যবহারের আগে নিশ্চিত হতে হবে, এর সুবিধা সম্ভাব্য ক্ষতি ও ব্যয়ের তুলনায় যথেষ্ট বেশি কি না।
প্রচলিত ক্যান্সার পরীক্ষার বিকল্প নয়
একবার রক্ত দিয়ে একাধিক ধরনের ক্যান্সারের সংকেত খোঁজার ধারণাটি নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। তবে এখনই ম্যামোগ্রাফি, জরায়ুমুখের ক্যান্সার স্ক্রিনিং বা অন্ত্রের ক্যান্সারের জন্য সুপারিশকৃত পরীক্ষাগুলো বাদ দেওয়া উচিত নয়। একইভাবে, শরীরে অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে শুধু রক্ত পরীক্ষার ওপর নির্ভর করাও নিরাপদ নয়।
ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি আরও নির্ভুল হলে ক্যান্সার শনাক্তকরণে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরীক্ষার সম্ভাবনাকে স্বীকার করার পাশাপাশি এর সীমাবদ্ধতাও বোঝা। কারণ ক্যান্সার শনাক্তকরণের প্রকৃত সাফল্য শুধু রোগের সংকেত খুঁজে পাওয়ায় নয়, বরং সময়মতো সঠিক রোগনির্ণয়, কার্যকর চিকিৎসা এবং রোগীর জীবনমান উন্নত করার মধ্যেই নিহিত।
