ব্রাজিলের আমাজন নদীর মোহনার কাছে সমুদ্রসীমায় তেলের সন্ধান পাওয়াকে দেশের ভবিষ্যতের জন্য বড় সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। নতুন এই আবিষ্কারকে তিনি বলেছেন, ‘ব্রাজিলের ভবিষ্যতের পাসপোর্ট’। তবে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়েও তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পেট্রোব্রাস গত ১৪ আগস্ট জানায়, উত্তরাঞ্চলীয় আমাপা রাজ্যের উপকূল থেকে প্রায় ১৭৫ কিলোমিটার দূরে গভীর সমুদ্রে খনন করা একটি অনুসন্ধানী কূপে হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। কূপটির নাম ‘মরফো’। এটি আমাজন অববাহিকার মুখসংলগ্ন ফোজ দো আমাজোনাস এলাকায়, ব্রাজিলের তথাকথিত ইকুয়েটোরিয়াল মার্জিনে অবস্থিত।
পরে পেট্রোব্রাসের প্রেসিডেন্ট মাগদা শামব্রিয়ার্দ নিশ্চিত করেন, সেখানে শুধু গ্যাস নয়, প্রকৃতপক্ষে তেলের নমুনাও পাওয়া গেছে। তবে এখনো ওই এলাকায় মোট কত পরিমাণ তেল রয়েছে কিংবা তা বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলন করা লাভজনক হবে কি না, সেটি নিশ্চিত নয়। এর জন্য আরও অনুসন্ধান ও কয়েকটি অতিরিক্ত কূপ খনন প্রয়োজন হবে।
‘ভবিষ্যতের পাসপোর্ট’ বললেন লুলা
১৭ আগস্ট আমাপা সফরের সময় পেট্রোব্রাসের একটি ড্রিলিং জাহাজ পরিদর্শন করেন লুলা। সেখানে তিনি তেলের একটি ছোট নমুনার বোতল হাতে নিয়ে নতুন আবিষ্কারের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।
লুলার মতে, এই তেল আবিষ্কার ব্রাজিলের জন্য কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গেও যুক্ত। তিনি নতুন আবিষ্কারকে ২০০৭ সালে ব্রাজিলের প্রি-সল্ট তেল আবিষ্কারের সঙ্গে তুলনা করেন এবং বলেন, আমাজন উপকূলের এই সম্ভাবনাও দেশের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, তেল অনুসন্ধান এগিয়ে নিলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দেশের অগ্রযাত্রা থামবে না। তার যুক্তি, ভবিষ্যতে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে যাওয়ার জন্য যে অর্থনৈতিক সক্ষমতা প্রয়োজন, তেল ও গ্যাস খাত সেই রূপান্তরে অর্থ জোগাতে পারে।
কতটা বড় হতে পারে এই আবিষ্কার?
এখনই আবিষ্কৃত তেলের মজুতের আকার বলা সম্ভব নয়। পেট্রোব্রাস জানিয়েছে, অনুসন্ধান কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে এবং আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই সম্ভাব্য মজুত সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। প্রতিষ্ঠানটি আরও কয়েকটি কূপ খননের পরিকল্পনা করছে।
তবে পুরো ইকুয়েটোরিয়াল মার্জিনকে ব্রাজিলের ভবিষ্যৎ তেল উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন সীমান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশটির প্রি-সল্ট তেল উৎপাদন আগামী দশকের মাঝামাঝি সময়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে নতুন মজুত নিশ্চিত করা পেট্রোব্রাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আমাজনের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ
অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিপরীতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে পরিবেশ নিয়ে। আমাজন বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি। যদিও তেলটি নদীর ভেতরে নয়, বরং আমাজন নদীর মোহনার কাছাকাছি সমুদ্রের গভীরে পাওয়া গেছে, তবু সম্ভাব্য তেল উত্তোলন নিয়ে পরিবেশবাদীদের উদ্বেগ রয়েছে।
তাদের আশঙ্কা, এই সংবেদনশীল সামুদ্রিক এলাকায় তেল ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও উপকূলীয় পরিবেশে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো তাই জীবাশ্ম জ্বালানির নতুন অনুসন্ধানকে ব্রাজিলের জলবায়ু প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে সমালোচনা করছে।
লুলা অবশ্য দাবি করছেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণ—দুটিই একসঙ্গে করা সম্ভব। তার সরকার একদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলছে, অন্যদিকে দেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি চাহিদা মেটাতে তেল অনুসন্ধানও চালিয়ে যাচ্ছে।
এই আবিষ্কার তাই ব্রাজিলের জন্য একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছে। তেলের মজুত কত বড় এবং শেষ পর্যন্ত তা বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য কি না—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
