ইন্দোনেশিয়ায় চলমান বন ও ভূমির দাবানল এখন শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবেশগত সংকট নয়; তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। সুমাত্রা ও বোর্নিও দ্বীপের কয়েকটি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত প্রদেশে প্রায় ৭৭ হাজার হেক্টর জমি আগুনে পুড়েছে বলে জানিয়েছে ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক আবহাওয়া পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। আগুন থেকে তৈরি ধোঁয়া ও বায়ুদূষণ সীমান্ত পেরিয়ে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কোথায় এবং কতটা আগুন
ইন্দোনেশিয়ার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সুমাত্রা ও বোর্নিওর ছয়টি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত প্রদেশে সেপ্টেম্বরের শুরু পর্যন্ত প্রায় ৭৭ হাজার হেক্টর এলাকা পুড়েছে।
এই অঞ্চলের বড় একটি অংশে রয়েছে বন, কৃষিজমি ও পিটল্যান্ড। পিট বা জলাভূমির মাটিতে আগুন একবার ঢুকে গেলে তা মাটির নিচে দীর্ঘ সময় ধরে জ্বলতে পারে। ফলে বাইরে আগুন কম দেখা গেলেও ধোঁয়া তৈরি হতে পারে দীর্ঘদিন।
শুষ্ক মৌসুম দীর্ঘ হলে এই ঝুঁকি আরও বাড়ে।
কেন ইন্দোনেশিয়ার আগুন এত বড় আঞ্চলিক সমস্যা
ইন্দোনেশিয়ার বন ও পিটল্যান্ডের আগুনের ধোঁয়া বাতাসের গতিপথের ওপর নির্ভর করে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও পৌঁছাতে পারে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এমন ‘হেজ’ বা ধোঁয়াশা নতুন নয়।
মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর অতীতেও ইন্দোনেশিয়ার দাবানলের ধোঁয়ার কারণে বায়ুমানের অবনতি দেখেছে। এতে মানুষের শ্বাসকষ্টসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে এবং স্কুল, বিমান চলাচল ও বাইরের কার্যক্রমে প্রভাব পড়তে পারে।
এবারও আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে একই ধরনের সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শুষ্ক আবহাওয়া কেন বিপদ বাড়াচ্ছে
জুন থেকে ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে অপেক্ষাকৃত শুষ্ক আবহাওয়া আগুন নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলেছে। শুকনো ঘাস, গাছপালা ও পিটল্যান্ড আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘ ও তীব্র শুষ্ক মৌসুমের সম্ভাবনা বাড়ছে বলে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন। তবে কোনো নির্দিষ্ট দাবানল সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত নিতে স্থানীয় আবহাওয়া, ভূমি ব্যবহার ও আগুনের উৎসসহ একাধিক বিষয় বিশ্লেষণ করতে হয়।
শুধু প্রাকৃতিক আগুন নয়
ইন্দোনেশিয়ার দাবানলের পেছনে প্রাকৃতিক আবহাওয়ার পাশাপাশি মানুষের ভূমিও গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিজমি পরিষ্কার করতে আগুন ব্যবহার, অব্যবস্থাপনা এবং পিটল্যান্ডে ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন অনেক সময় আগুনকে বড় করে তুলতে পারে।
তাই আগুন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ভূমি ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় পর্যায়ে আগুন ব্যবহারের ওপর নজরদারি বাড়ানোও জরুরি।
ইন্দোনেশিয়া ইতিমধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন ব্যবস্থা নিচ্ছে। কিন্তু বিশাল ভূখণ্ড ও দুর্গম বনাঞ্চলের কারণে দ্রুত সব এলাকায় পৌঁছানো কঠিন।
প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য সতর্কবার্তা
মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো বাতাসের মান। ধোঁয়ার ঘনত্ব বাড়লে সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে শুরু করে বড় শহর পর্যন্ত বায়ুদূষণের প্রভাব দেখা দিতে পারে।
এ কারণে দাবানলকে শুধু ইন্দোনেশিয়ার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। আসিয়ান অঞ্চলে সীমান্তপারের পরিবেশগত দুর্যোগ মোকাবিলায় তথ্য বিনিময়, আগাম সতর্কতা ও সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন।
ইন্দোনেশিয়ার ৭৭ হাজার হেক্টর বন ও ভূমি পুড়ে যাওয়া তাই একটি বড় পরিবেশগত সতর্কসংকেত। আগুন যদি আরও ছড়ায় এবং বাতাসের গতিপথ প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে যায়, তাহলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আবারও বড় ধরনের ধোঁয়াশা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান শুধু আগুন নেভানো নয়। পিটল্যান্ড সংরক্ষণ, ভূমি ব্যবস্থাপনা, কৃষিতে আগুনের ব্যবহার কমানো এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাই হতে পারে ভবিষ্যতের বড় দাবানল ও সীমান্তপারের ধোঁয়া ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ।
