মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবার নতুন এক কূটনৈতিক মোড় নিয়েছে। ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথিদের দ্রুত সামরিক অগ্রযাত্রায় লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তেই সৌদি আরব সাহায্যের জন্য দ্বারস্থ হয়েছে চীনের। আর রিয়াদের সেই আবেদনের পরই বেইজিং ব্যক্তিগতভাবে তেহরানকে হুথিদের ওপর নিজেদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে তাদের লাগাম টানার আহ্বান জানিয়েছে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিন ইরানি সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, চীনের এই বার্তা তাদের প্রকাশ্য অবস্থানের চেয়ে অনেক বেশি সরাসরি ছিল। বেইজিং প্রকাশ্যে সংযম, সংলাপ ও নিরাপদ নৌ চলাচলের কথা বললেও ব্যক্তিগত আলোচনায় ইরানকে হুথিদের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
কেন চীনের কাছে সাহায্য চাইল সৌদি আরব
গত এক সপ্তাহে ইয়েমেনের হুথিরা লোহিত সাগরের উপকূল এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালির আশপাশে দ্রুত অগ্রসর হয়েছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকা ও দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ফলে সৌদি আরবের লোহিত সাগরভিত্তিক তেল রপ্তানি এবং সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাব আল-মান্দাব প্রণালি বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার। এই পথ দিয়ে ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন হয়। ফলে হুথিদের সামরিক তৎপরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব শুধু সৌদি আরব বা ইয়েমেনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
এই পরিস্থিতিতেই রিয়াদ বেইজিংয়ের দ্বারস্থ হয়। চীন এর আগে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছিল। ফলে তেহরানের ওপর বেইজিংয়ের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব কাজে লাগানোর প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
ইরানের ওপর চীনের বিশেষ প্রভাব কেন গুরুত্বপূর্ণ
চীন এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। দেশটির তেল রপ্তানির বড় অংশও যায় চীনে। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সমুদ্রপথে ইরানের রপ্তানি করা তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনেছে চীন; দৈনিক গড় সরবরাহ ছিল প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল।
অর্থাৎ তেহরানের ওপর চাপ প্রয়োগের ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের হাতে অর্থনৈতিক প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম রয়েছে। তবে চীন সেই প্রভাব কতটা ব্যবহার করতে প্রস্তুত, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
রয়টার্সের সূত্রগুলো জানিয়েছে, হুথিদের নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হলে ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো হুমকি চীন দেয়নি। বরং বেইজিং মূলত আঞ্চলিক সংঘাত যাতে আরও ছড়িয়ে না পড়ে, সেই লক্ষ্যেই তেহরানের সহযোগিতা চেয়েছে।
তেহরানের জবাবেও উঠল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল প্রসঙ্গ
চীনের বার্তার জবাবে ইরান সরাসরি হুথিদের কর্মকাণ্ড বন্ধ বা সীমিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে—এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
সূত্রগুলোর দাবি, তেহরান বরং জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ও শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে প্রথমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের অবসান ঘটাতে হবে।
অর্থাৎ চীনের কূটনৈতিক উদ্যোগের সামনে তেহরান আঞ্চলিক সংঘাতের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটকে সামনে এনেছে। হুথিদের কর্মকাণ্ডকে আলাদা কোনো সমস্যা হিসেবে দেখার বদলে ইরান এটিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান বৃহত্তর সংঘাতের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
একসঙ্গে হরমুজ ও বাব আল-মান্দাবের ঝুঁকি
চীনের উদ্বেগের মূল জায়গা এখানেই। মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ—হরমুজ প্রণালি এবং বাব আল-মান্দাব—একই সময়ে অস্থির হয়ে উঠলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
হরমুজ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহন হয়। অন্যদিকে বাব আল-মান্দাব লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি করে। একটি পথ ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, অন্যটির ওপর হুথিদের সামরিক তৎপরতার প্রভাব বাড়ছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাব আল-মান্দাব দিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ প্রবাহিত হয়। হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা তাই শুধু সামরিক নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্যও বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে।
চীনের সামনে কঠিন কূটনৈতিক পরীক্ষা
চীন একদিকে ইরানের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গেও তার বিশাল বাণিজ্যিক স্বার্থ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীনের বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি হয় এবং উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের দেশগুলোর সঙ্গে দেশটির বার্ষিক বাণিজ্যও কয়েকশ’ বিলিয়ন ডলারের।
২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের ঘটনা বেইজিংয়ের আঞ্চলিক কূটনৈতিক সক্ষমতার একটি বড় উদাহরণ। কিন্তু হুথি ইস্যুতে সেই প্রভাব কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
কারণ তেহরানের কাছে হুথিরা শুধু একটি আঞ্চলিক গোষ্ঠী নয়; তারা ইরানের বৃহত্তর আঞ্চলিক কৌশলের অংশ। ফলে চীনের অনুরোধ মানলেও তা কতটা এবং কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সেটি নির্ভর করবে ইরানের সামরিক ও কূটনৈতিক হিসাবের ওপর।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই একটাই—বেইজিং কি শুধু কূটনৈতিক অনুরোধেই থামবে, নাকি প্রয়োজনে তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবও ব্যবহার করবে? উত্তরটি নির্ধারণ করতে পারে লোহিত সাগরের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের পরবর্তী গতিপথ।
