নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ইরানকে নিয়ে ভয়াবহ হুমকি দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধ থামাতে চুক্তির দরজা খোলা রাখলেও সেই চুক্তি না হলে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ‘ধ্বংস’ করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। একই বক্তব্যে ট্রাম্প দাবি করেছেন, শেষ পর্যন্ত তেহরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা হতে পারে। ফলে জাতিসংঘে তার ভাষণে একই সঙ্গে যুদ্ধের হুমকি ও কূটনীতির সম্ভাবনা—দুই বার্তাই উঠে এসেছে।
চুক্তি নাকি ধ্বংস—ট্রাম্পের প্রশ্ন
২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে প্রায় ৩৭ মিনিটের বক্তব্য দেন ট্রাম্প। ইরান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তার সামনে এখন বড় সিদ্ধান্ত—তেহরানের সঙ্গে এমন একটি চুক্তি করা, যাতে দেশটি পুনর্গঠনের সুযোগ পায়, নাকি সামরিকভাবে আরও কঠোর পথে যাওয়া।
ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখাই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের অন্যতম লক্ষ্য। তিনি দাবি করেন, ইরানকে ঘিরে আগের মার্কিন প্রশাসনগুলো দীর্ঘদিন সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হয়েছে। তার প্রশাসন সেই অবস্থার পরিবর্তন করেছে।
তবে চুক্তির সম্ভাবনা পুরোপুরি বাতিল করেননি ট্রাম্প। বরং তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তি হতে পারে।
জাতিসংঘেই আলোচনার নতুন দরজা
ট্রাম্পের বক্তব্যের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, কঠোর হুমকির পাশাপাশি তার প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইরানি প্রতিনিধিদের যোগাযোগের খবর সামনে আসা।
পরে ট্রাম্প জানান, মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফসহ যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা নিউইয়র্কে ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেছেন। আলোচনাটি কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রাম্প বৈঠককে ইতিবাচক বলে বর্ণনা করেছেন এবং ভবিষ্যতে আরও যোগাযোগের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
অর্থাৎ প্রকাশ্য মঞ্চে কঠোর সামরিক বার্তা দেওয়ার পরও পর্দার আড়ালে আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
হরমুজও আলোচনার কেন্দ্রে
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংকটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে আছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথটিতে যুদ্ধের প্রভাব পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমালে এবং ইরানের বন্দর অবরোধ প্রত্যাহার করলে তেহরান এক সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে প্রস্তুত। একই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নিউইয়র্কে থাকা ইরানি প্রতিনিধিদলের আলোচনার পূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে।
এতে বোঝা যাচ্ছে, যুদ্ধ থামানোর সম্ভাব্য আলোচনায় শুধু পারমাণবিক কর্মসূচি নয়, সামরিক অভিযান, বন্দর অবরোধ এবং আন্তর্জাতিক নৌপথও বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে।
তেহরানের অবস্থানও কঠোর
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান নিউইয়র্কে যাওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তীব্র অভিযোগ তোলেন। তার বক্তব্য, ওয়াশিংটন সামরিক চাপের মাধ্যমে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে চাইছে।
ইরানি কর্মকর্তারা একই সঙ্গে জানিয়েছেন, তারা কূটনীতির দরজা পুরোপুরি বন্ধ করছেন না। তবে আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে—এমন অবস্থানই তেহরান তুলে ধরছে।
ফলে জাতিসংঘের মঞ্চে ট্রাম্পের ‘চুক্তি অথবা ধ্বংস’ বার্তার পর এখন নজর আলোচনার দিকে। একদিকে সামরিক চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে নিউইয়র্কেই দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের মধ্যে যোগাযোগ শুরু হয়েছে। এই দ্বৈত অবস্থানই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংকটকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
