জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ইসরায়েল ও ফ্রান্সের মধ্যে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। গাজা যুদ্ধ, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী সহিংসতা এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের অধিকার নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে ম্যাক্রোঁ এমন মন্তব্য করেন, যার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।
মঙ্গলবারের ভাষণে ম্যাক্রোঁ গাজার পরিস্থিতিকে বিশ্ববাসীর জন্য ‘লজ্জাজনক’ দৃশ্য হিসেবে বর্ণনা করেন এবং পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে ইসরায়েলের নীতির সমালোচনা করেন।
গাজাকে ঘিরে ম্যাক্রোঁর তীব্র সমালোচনা
জাতিসংঘের মঞ্চে ম্যাক্রোঁ বলেন, গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন দাবি করা হলেও বাস্তবে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর জন্য পর্যাপ্ত করিডর চালু হয়নি।
তার বক্তব্যে উঠে আসে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন। তিনি বলেন, গাজার পরিস্থিতিতে বিশ্ব যদি নিষ্ক্রিয় থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
ম্যাক্রোঁর এই বক্তব্য আসে ট্রাম্পের জাতিসংঘ ভাষণের কয়েক ঘণ্টা পর। ট্রাম্প তার প্রশাসনের গাজা-সংক্রান্ত কূটনৈতিক উদ্যোগকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। ফলে একই দিনে একই মঞ্চে দুই পশ্চিমা নেতার বক্তব্যে গাজা পরিস্থিতি নিয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
পশ্চিম তীর নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য
সবচেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় পশ্চিম তীর নিয়ে ম্যাক্রোঁর বক্তব্যে। তিনি ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ও ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে কথা বলার সময় হামাসের পশ্চিম তীরে কার্যক্রম প্রসঙ্গে এমন একটি মন্তব্য করেন, যা ইসরায়েলে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা দাবি করেন, পশ্চিম তীরে হামাসের উপস্থিতি ও হামলার ইতিহাস রয়েছে। তারা ম্যাক্রোঁর বক্তব্যকে বাস্তবতার সঙ্গে অসঙ্গত বলে প্রত্যাখ্যান করেন।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় ম্যাক্রোঁর মন্তব্যকে ‘চরম অযৌক্তিক’ বলে আখ্যা দেয়। তাদের বক্তব্যে সাম্প্রতিক পশ্চিম তীরের একটি হামলার কথাও তুলে ধরা হয়, যেখানে ফরাসি নাগরিকত্ব থাকা এক ইসরায়েলি নিহত হন।
ফরাসি ব্যাখ্যায় ভিন্ন অর্থ
তবে পরে ফরাসি এক কূটনৈতিক কর্মকর্তা ইসরায়েলি সমালোচনার জবাব দিয়ে জানান, ম্যাক্রোঁর বক্তব্যের অর্থ ছিল হামাস পশ্চিম তীর শাসন করে না—হামাসের কোনো ধরনের উপস্থিতি নেই, এমন দাবি করা তার উদ্দেশ্য ছিল না।
এই ব্যাখ্যা সত্ত্বেও রাজনৈতিক উত্তেজনা কমেনি।
দুই রাষ্ট্র সমাধানের প্রশ্ন
ম্যাক্রোঁর বক্তব্যের বড় অংশজুড়ে ছিল ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি ও দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেবল কাগজে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়ে বাস্তবে যদি গাজা ও পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি পরিবর্তন না হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিশ্বাসযোগ্যতা কতটা থাকে।
ফ্রান্স দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন—দুই রাষ্ট্রের পাশাপাশি অস্তিত্বের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ ও সহিংসতা নিয়ে প্যারিসের সমালোচনা আরও প্রকাশ্য হয়েছে।
ফলে জাতিসংঘে ম্যাক্রোঁর বক্তব্য শুধু গাজা পরিস্থিতির সমালোচনা নয়; এটি ফ্রান্স-ইসরায়েল সম্পর্কের মধ্যেও নতুন রাজনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি করেছে। এখন নজর থাকবে ম্যাক্রোঁর বক্তব্যের পর ইসরায়েল ও ফ্রান্সের কূটনৈতিক যোগাযোগ কোন দিকে যায় এবং পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়ে ইউরোপীয় চাপ আরও বাড়ে কি না।
