যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতের অবসানে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। কাতারের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনের কাছে সাত দফা শর্তসংবলিত একটি পারমাণবিক প্রস্তাব পাঠিয়েছে তেহরান। তবে আলোচনায় বসার আগে নিজেদের শর্তগুলো পূরণের দাবি জানিয়েছে দেশটি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, যেকোনো সমঝোতার আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। ফলে যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাবনা তৈরি হলেও দুই দেশের অবস্থানের ব্যবধান এখনো যথেষ্ট।
৫ নভেম্বর ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, কাতারের মাধ্যমে পাঠানো প্রস্তাবটি যুক্তরাষ্ট্র পর্যালোচনা করছে। তবে প্রস্তাবের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওয়াশিংটন তেহরানের সাতটি শর্ত মেনে নিলেই কেবল আলোচনার পরবর্তী ধাপে যাওয়া সম্ভব হবে।
এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাত নতুন করে বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরানও বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
কী রয়েছে ইরানের সাত দফা শর্তে?
ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে সাত দফা শর্তের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করেনি। তবে দেশটির কর্মকর্তাদের বক্তব্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি সামনে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ মুক্ত করা এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান।
এ ছাড়া ইরানের ওপর মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার, সামরিক অভিযান বন্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের অবসানও তেহরানের দাবির অংশ বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই জানিয়েছেন, এসব শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসার বিষয়ে তেহরান আগ্রহী নয়।
তবে সাতটি শর্তের সব কটির সুনির্দিষ্ট ভাষা এখনো প্রকাশিত হয়নি। ফলে প্রস্তাবটির বিস্তারিত কাঠামো নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের অনড় অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের বিরোধের অন্যতম প্রধান বিষয় দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি। ওয়াশিংটনের আশঙ্কা, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের দিকে এগোচ্ছে। যদিও তেহরান বরাবরই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত।
মার্কিন প্রশাসন মনে করছে, যেকোনো আলোচনার শুরুতেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতা প্রয়োজন। বিশেষ করে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত, ভবিষ্যতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সীমা এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার নিয়ে একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করতে চায় ওয়াশিংটন।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার হিসাবে, ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ ৪৪০ দশমিক ৯ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে। এই পরিমাণ ও সমৃদ্ধকরণের মাত্রা আন্তর্জাতিক উদ্বেগের অন্যতম কারণ।
কাতারের মধ্যস্থতায় কেন নতুন উদ্যোগ?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাতার গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর আগে দুই দেশের মধ্যে বন্দিবিনিময় এবং বিভিন্ন কূটনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও দোহা ভূমিকা রেখেছে।
এবারও কাতারের মাধ্যমে প্রস্তাব আদান-প্রদানের উদ্দেশ্য হলো সরাসরি আলোচনায় যাওয়ার আগে দুই পক্ষের অবস্থান বোঝা এবং সমঝোতার সম্ভাব্য ক্ষেত্র তৈরি করা।
এদিকে মধ্যস্থতাকারীরা একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছেন। আলোচনায় এমন একটি প্রস্তাব এসেছে, যেখানে মার্কিন অবরোধ শিথিল এবং ইরানের কিছু আটকে থাকা অর্থ ছাড়ের বিনিময়ে পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
তবে এটি এখনো চূড়ান্ত চুক্তি নয়।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের উল্লেখযোগ্য অংশ এই জলপথ দিয়ে চলাচল করে। ফলে ইরান যদি প্রণালিটি বন্ধ রাখে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে।
ইতিমধ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম, পরিবহন ব্যয় এবং বীমা খরচ নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো এই পরিস্থিতির বড় অর্থনৈতিক প্রভাবের মুখে পড়তে পারে।
যুদ্ধ বন্ধের পথ কতটা সহজ?
কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার হলেও দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট গভীর। ইরান চায় প্রথমে নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ প্রত্যাহার করা হোক। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নিশ্চয়তা ছাড়া বড় ধরনের ছাড় দিতে আগ্রহী নয়।
এর মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন নতুন সামরিক অভিযানের সম্ভাবনাও পুরোপুরি নাকচ করেনি। ইরানও জানিয়েছে, আবার হামলা হলে তারা আরও বিস্তৃতভাবে পাল্টা জবাব দিতে প্রস্তুত।
ফলে কাতারের মাধ্যমে পাঠানো সাত দফা প্রস্তাব যুদ্ধ বন্ধের একটি নতুন কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করলেও সমঝোতার পথ এখনো কঠিন। শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষ নিজেদের দাবিতে কতটা ছাড় দিতে প্রস্তুত, তার ওপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের ভবিষ্যৎ।
