যুক্তরাজ্যের মন্ত্রীদের বিতর্কিত ভারতীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকেন্দ্র ভান্তারার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ না রাখার পরামর্শ দিয়েছেন দেশটির সরকারি কর্মকর্তারা। প্রাণী আমদানি, বিপন্ন প্রজাতির বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিষয়ক নিয়মকানুন নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যে এই নির্দেশনা সামনে এসেছে। ভারতের অন্যতম ধনকুবের মুকেশ আম্বানির ছেলে অনন্ত আম্বানির প্রতিষ্ঠিত বিশাল এই প্রাণী সংরক্ষণকেন্দ্রকে ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যখন নতুন করে প্রশ্ন উঠছে, তখন ব্রিটিশ সরকারের এমন অবস্থান বিষয়টিকে আরও আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে বন্যপ্রাণী বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক চুক্তি সাইটিসের (সিআইটিইএস) নিয়ম বাস্তবায়ন এবং এ ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার বিষয়টি। বিশেষ করে বিপন্ন প্রাণীর উৎস, আমদানি প্রক্রিয়া এবং সেগুলো সংগ্রহের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকায় ভান্তারার সঙ্গে মন্ত্রী পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক তৈরি করা উচিত হবে না বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।
মন্ত্রীদের কেন দূরে থাকার পরামর্শ
যুক্তরাজ্যের পরিবেশ, খাদ্য ও গ্রামীণ বিষয়ক দপ্তরের (ডেফরা) অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে ভান্তারার সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পৃক্ত না হওয়ার সুপারিশ করা হয়। গত জুলাইয়ে তৈরি হওয়া একাধিক সরকারি নথিতে এ বিষয়ে সতর্কতা তুলে ধরা হয়েছিল।
ভান্তারার প্রতিনিধিত্বকারী একটি জনসংযোগ ও লবিং প্রতিষ্ঠান ব্রিটিশ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের উদ্যোগ নিয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটি ভান্তারার কার্যক্রম তুলে ধরতে যুক্তরাজ্যের সমর্থন চেয়েছিল। পাশাপাশি ভারতের গুজরাটে অবস্থিত প্রাণী সংরক্ষণকেন্দ্রটি পরিদর্শনের জন্য ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণও জানানো হয়েছিল।
তবে এ প্রস্তাব নিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে সতর্কতা তৈরি হয়। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাজ্য যখন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে, তখন বিতর্কিত একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
আসন্ন আন্তর্জাতিক বৈঠকের আগে ভান্তারার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের বিষয়টি বিশেষভাবে সংবেদনশীল হয়ে উঠেছিল। ফলে মন্ত্রীদের এ ধরনের যোগাযোগ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়।
বিপন্ন প্রাণী আমদানি নিয়ে প্রশ্ন
ভান্তারা নিজেদের বন্যপ্রাণী উদ্ধার, পুনর্বাসন ও সংরক্ষণকেন্দ্র হিসেবে পরিচয় দেয়। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, সেখানে বিপুলসংখ্যক প্রাণীর আশ্রয় ও পরিচর্যার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এত বড় পরিসরে প্রাণী সংগ্রহের উৎস এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিধি অনুসরণের বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের সরকারি নথিতে দেখা যায়, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশটি থেকে ভান্তারায় জীবন্ত প্রাণী পাঠানোর জন্য ১৫২টি রপ্তানি ও পুনর্নিরাপত্তা অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এসব অনুমতির আওতায় গিবন, বাঘ, লেমুরসহ বিভিন্ন বিপন্ন প্রাণীর নাম রয়েছে।
তবে অনুমতি দেওয়া মানেই সব প্রাণী বাস্তবে ভারতে পাঠানো হয়েছে, এমন নয়। নথিতে দেখা যায়, কয়েকটি অনুমতি ব্যবহার করা হয়নি, কিছু বাতিল হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রাণী স্থানান্তরের তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে অনুমতির সংখ্যা ও বাস্তবে স্থানান্তরিত প্রাণীর সংখ্যার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
বিশেষ করে বিপন্ন প্রাণীর ক্ষেত্রে এ ধরনের অনুমতি দেওয়ার আগে প্রাণীর উৎস, মালিকানা এবং স্থানান্তরের উদ্দেশ্য যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে প্রাণী স্থানান্তরের সুযোগ থাকলেও সেটিকে বাণিজ্যিক লেনদেনের আড়াল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
বাজপাখি আমদানির আবেদন ঘিরে নতুন বিতর্ক
ভান্তারার জন্য যুক্তরাজ্য থেকে বাজপাখি ও বাজপাখির সংকর প্রজাতি আমদানির কয়েকটি আবেদন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন ব্রিটিশ কর্মকর্তারা। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের একটি পাখি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রায় ৫০ হাজার পাউন্ডের একটি অনুদানের তথ্য সামনে আসে।
কর্মকর্তাদের উদ্বেগ ছিল, এই অর্থপ্রদান প্রকৃতপক্ষে অনুদান, নাকি প্রাণী স্থানান্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো বাণিজ্যিক লেনদেন—তা যাচাই করা প্রয়োজন। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও উদ্যোগ নেয়।
ভান্তারার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এসব বাজপাখি শেষ পর্যন্ত স্থানান্তর করা হয়নি। তবে ঘটনাটি প্রাণী আমদানির প্রক্রিয়ায় আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থার নজরদারিতে ভান্তারা
বন্যপ্রাণী ও বিপন্ন প্রজাতির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে সাইটিস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই চুক্তির আওতায় কোনো প্রাণী এক দেশ থেকে অন্য দেশে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। বিশেষ করে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা প্রাণীর বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কঠোর বিধিনিষেধ।
ভান্তারাকে ঘিরে আগেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তদন্ত ও পর্যালোচনার উদ্যোগ দেখা গেছে। প্রাণী সংগ্রহের উৎস এবং আমদানির নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটি অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টেও এ-সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে তদন্তের পর পরিচালকদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে ব্রিটিশ সরকারের এই সতর্কতা কেবল একটি প্রাণী সংরক্ষণকেন্দ্রকে ঘিরে বিতর্ক নয়; বরং আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী বাণিজ্যে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।
ভান্তারার কার্যক্রম নিয়ে বিতর্কের নিষ্পত্তি কত দ্রুত হয়, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বিপন্ন প্রাণী সংরক্ষণের নামে পরিচালিত যেকোনো বড় উদ্যোগের ক্ষেত্রে প্রাণীর উৎস, স্থানান্তরের বৈধতা এবং আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা যে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের অবস্থান তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
