রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ চলছে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে। প্রতিদিন ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হচ্ছে, দেশের বড় একটি অংশ যুদ্ধের বাস্তবতায় বিপর্যস্ত। এমন সময়েই ইউক্রেনের রাজনীতিতে নতুন বিস্ফোরণ ঘটালেন দেশটির সদ্য বরখাস্ত হওয়া প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভ। তিনি যুদ্ধ চলাকালেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন।
ফেদোরভের এই আহ্বানকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির জন্য রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত ১৮ আগস্ট রাতে অনলাইনে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় ফেদোরভ বলেন, দীর্ঘ যুদ্ধের মধ্যেও ইউক্রেনকে পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরতে হবে। তার যুক্তি, গণতন্ত্রকে যুদ্ধের কারণে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্থগিত রাখা উচিত নয়। তিনি দেশের শাসনব্যবস্থায় সংকট, প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবর্তনবিমুখতা এবং দুর্নীতির অভিযোগও সামনে আনেন। যদিও তিনি সরাসরি জেলেনস্কির নাম উল্লেখ করেননি, তার বক্তব্যের রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে খুব কমই সন্দেহ রয়েছে।
এই দাবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ইউক্রেনে বর্তমানে সামরিক আইন কার্যকর থাকায় নির্বাচন আয়োজন আইনগতভাবে নিষিদ্ধ। রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর ২০২২ সালে সামরিক আইন জারি হয় এবং যুদ্ধ চলাকালে প্রেসিডেন্ট, পার্লামেন্ট বা স্থানীয় নির্বাচন না করার বিধান রয়েছে। জেলেনস্কির পাঁচ বছরের মেয়াদ ২০২৪ সালে শেষ হলেও নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ফেদোরভ নিজে কি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান? তিনি তার ভিডিও বার্তায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থিতা ঘোষণা করেননি। কিন্তু বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছে, তার বক্তব্য ইউক্রেনের রাজনীতিতে নতুন অবস্থান তৈরির একটি স্পষ্ট পদক্ষেপ। সাম্প্রতিক জনমত জরিপের ইঙ্গিত অনুযায়ী, সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে ফেদোরভ জেলেনস্কির জন্য শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেন বলেও কিছু প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও ফেদোরভ ছিলেন ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী। গত জুলাইয়ে তাকে আকস্মিকভাবে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তার বরখাস্তের পর কিয়েভসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ শুরু হয় এবং সমর্থকেরা তাকে পুনর্বহালের দাবি জানান। পরে সামরিক নেতৃত্বেও পরিবর্তন আসে। কিন্তু প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদে অন্য কাউকে মনোনয়ন দেওয়ার পর ফেদোরভের রাজনীতিতে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়।
এখন প্রশ্ন হলো, যুদ্ধের মধ্যে নির্বাচন আদৌ সম্ভব কি না। ইউক্রেনের লাখো নাগরিক দেশের বাইরে অবস্থান করছেন, বিপুলসংখ্যক মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত এবং দেশের কিছু ভূখণ্ড রাশিয়ার দখলে রয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা সেনাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা, বিদেশে থাকা নাগরিকদের ভোটের ব্যবস্থা করা এবং রুশ হামলার মধ্যে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে নির্বাচন আয়োজন একটি বিশাল বাস্তব ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জ।
ফেদোরভের নিজের সমর্থকদের মধ্যেও তার নির্বাচনের দাবিতে বিভাজন দেখা দিয়েছে। তাকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন করা কিছু বিক্ষোভ সংগঠক যুদ্ধকালীন নির্বাচনকে আইনগত ও বাস্তবিকভাবে অসম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন এবং তার এই দাবির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেছেন।
তবে ফেদোরভের বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইউক্রেন সরকার দুর্নীতির অভিযোগ এবং রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে। প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তাকে ঘিরে তদন্ত ও অর্থপাচারের অভিযোগ নতুন করে সরকারকে বিব্রত করেছে। এই পরিস্থিতিতে সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রীর নির্বাচন দাবি জেলেনস্কির ওপর রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
যুদ্ধের মধ্যে নির্বাচন হবে কি না, সেটি এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—মিখাইলো ফেদোরভ এমন একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন সামনে এনেছেন, যা ২০২২ সালের পর ইউক্রেনের রাজনীতিতে কার্যত নিষিদ্ধ আলোচনার বিষয় ছিল।
রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের পাশাপাশি এবার কি জেলেনস্কিকে নিজের দেশের ভেতরেও নতুন রাজনৈতিক লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হবে? ফেদোরভের দাবির পর ইউক্রেনের রাজনীতিতে এখন সেই প্রশ্নই সবচেয়ে জোরালোভাবে উঠছে।
