ইউরোপে একটি প্রশ্ন দ্রুতই কৌশলগত বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে—আমেরিকা যদি একদিন ইউরোপের নিরাপত্তার প্রধান শক্তি হিসেবে আগের মতো না থাকে, তাহলে ইউরোপ কি নিজেকে রক্ষা করতে পারবে?
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ডোনাল্ড ট্রাম্পের burden-sharing নীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে অভূতপূর্ব গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানো আর আমেরিকার নিরাপত্তা ছাতা থেকে বেরিয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়।
কারণ ইউরোপ এখনো মার্কিন সামরিক সক্ষমতার ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল।
কার্নেগি এন্ডাওমেন্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৭০ হাজার সামরিক সদস্য এবং ৩০টির বেশি স্থায়ী ঘাঁটি রয়েছে। এর পাশাপাশি ইউরোপীয় দেশগুলো মার্কিন গোয়েন্দা নজরদারি, early warning, missile defence, long-range strike এবং command-and-control ব্যবস্থার ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভর করে।
অর্থাৎ ইউরোপীয় সেনাবাহিনী আছে, যুদ্ধবিমান আছে, ট্যাংক আছে, নৌবাহিনী আছে—কিন্তু আধুনিক যুদ্ধে প্রয়োজনীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ ‘enabler’ এখনো আমেরিকান।
এই বাস্তবতা ইউরোপের কৌশলগত স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় বাধা।
তবু পরিবর্তন শুরু হয়েছে।
২০২৫ সালের ন্যাটো সম্মেলনে সদস্যরা ২০৩৫ সালের মধ্যে GDP-এর ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষায় বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়। এর মধ্যে অন্তত ৩.৫ শতাংশ সরাসরি সামরিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতার জন্য এবং বাকি অংশ অবকাঠামো, resilience ও প্রতিরক্ষা-সম্পর্কিত খাতে ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে।
ইউরোপীয় দেশগুলো ইতিমধ্যে ব্যয় বাড়িয়েছে। NATO জানিয়েছে, ইউরোপীয় মিত্র ও কানাডা ২০২৫ সালে আগের বছরের তুলনায় বাস্তব হিসাবে প্রায় ২০ শতাংশ বেশি প্রতিরক্ষা ব্যয় করেছে।
কিন্তু টাকা খরচ করলেই কি স্বনির্ভরতা আসে?
না।
ইউরোপের বড় সমস্যা হলো প্রতিরক্ষা শিল্পের খণ্ডিত কাঠামো। ২৭টি দেশের নিজস্ব সামরিক ক্রয়ব্যবস্থা, আলাদা অস্ত্র প্রকল্প এবং বিভিন্ন ধরনের প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। ফলে একই ধরনের অস্ত্রের জন্যও একাধিক আলাদা ব্যবস্থা তৈরি হয়।
এতে খরচ বাড়ে এবং উৎপাদন ক্ষমতা ছড়িয়ে যায়।
ইউরোপীয় Court of Auditors-এর সাম্প্রতিক মূল্যায়নও সতর্ক করেছে যে ২০৩০ সালের মধ্যে বড় ধরনের বহিরাগত আক্রমণ মোকাবিলায় EU-এর প্রস্তুতি এখনো অনিশ্চিত। ২০২০ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত প্রতিরক্ষা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও মার্কিন নির্ভরতা, জাতীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিভাজন এবং উৎপাদন bottleneck রয়ে গেছে।
আর এখানেই আসে রাশিয়ার প্রশ্ন।
রাশিয়া ইউক্রেনে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। ইউরোপের পূর্বাঞ্চলীয় দেশগুলো—বিশেষ করে বাল্টিক অঞ্চল ও পোল্যান্ড—রুশ সামরিক শক্তিকে সরাসরি নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখছে। ফলে তারা আমেরিকার ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইলেও NATO কাঠামো থেকে বেরিয়ে যেতে চাইছে না।
বরং ইউরোপের বর্তমান চিন্তা হলো—NATO থাকবে, কিন্তু ইউরোপের সামরিক স্তম্ভ আরও শক্তিশালী হবে।
NATO মহাসচিব মার্ক রুটে এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইনও বলেছেন, জোটকে আরও ইউরোপীয় সক্ষমতা অর্জন করতে হবে, যাতে আমেরিকার ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কমে।
অর্থাৎ লক্ষ্য এখন ‘America out, Europe in’ নয়; বরং ‘Europe stronger within NATO’।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিতে অনিশ্চয়তা ইউরোপীয় পরিকল্পনাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। ওয়াশিংটন বারবার ইউরোপীয় মিত্রদের নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য বেশি অর্থ ব্যয় করতে বলেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক footprint নিয়ে ইউরোপে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কিন্তু পুরোপুরি আমেরিকা ছাড়া ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সময় লাগবে।
পারমাণবিক প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও সমস্যা আছে। ফ্রান্সের নিজস্ব পারমাণবিক শক্তি থাকলেও সেটি পুরো ইউরোপের জন্য মার্কিন nuclear umbrella-এর সরাসরি বিকল্প নয়।
তাই ইউরোপের সামনে বাস্তবসম্মত পথ হলো—নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প, গোলাবারুদ উৎপাদন, বিমান প্রতিরক্ষা, ড্রোন, স্যাটেলাইট, intelligence ও logistics শক্তিশালী করা; কিন্তু একই সঙ্গে NATO ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক ধরে রাখা।
কারণ রাশিয়ার হুমকি যতদিন থাকবে, ইউরোপের পক্ষে রাতারাতি আমেরিকাকে বাদ দেওয়া সম্ভব নয়।
ফলে ইউরোপ হয়তো আমেরিকার নিরাপত্তা ছাতা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে না। বরং ছাতাটি ধরে রেখেই নিজের হাতে আরেকটি ছাতা তৈরির চেষ্টা করছে।
