প্রিন্সেস ডায়ানার মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পর ব্রিটিশ রাজপরিবারকে ঘিরে নতুন করে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ডায়ানার ছোট ভাই আর্ল চার্লস স্পেন্সারের নতুন স্মৃতিকথায় দাবি করা হয়েছে, ১৯৯৭ সালে ডায়ানার মৃত্যুর মাত্র কয়েক দিন পর তৎকালীন প্রিন্স চার্লস এক উত্তপ্ত ফোনালাপে বলেছিলেন, ‘নিশ্চিন্ত থাকুন, আমরা তাকে শিগগিরই ভুলে যাব।’
ডায়ানার শেষকৃত্যে তার দুই ছেলে প্রিন্স উইলিয়াম ও প্রিন্স হ্যারিকে মায়ের কফিনের পেছনে হাঁটানো হবে কি না—এই বিতর্কের মধ্যেই কথাটি বলা হয়েছিল বলে দাবি করেছেন স্পেন্সার। তার নতুন বই ‘সোয়ান সং: ডায়ানা, মাই সিস্টার’ প্রকাশের আগেই বইটির কিছু অংশ প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
শেষকৃত্যের আয়োজন নিয়ে শুরু হয়েছিল বিরোধ
১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট প্যারিসে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান ডায়ানা। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে তার মৃত্যু গোটা বিশ্বে ব্যাপক শোকের সৃষ্টি করে। কয়েক দিনের মধ্যেই তার শেষকৃত্যের আয়োজন নিয়ে রাজপরিবার ও ডায়ানার পরিবারের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়।
স্পেন্সারের বর্ণনা অনুযায়ী, রাজপ্রাসাদের পক্ষ থেকে তাকে জানানো হয়েছিল যে উইলিয়াম ও হ্যারি মায়ের কফিনের পেছনে হাঁটবে। তখন উইলিয়ামের বয়স ছিল ১৫ এবং হ্যারির মাত্র ১২।
ডায়ানার ভাই দাবি করেছেন, তিনি এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। তার মতে, এত অল্প বয়সী দুই ছেলের জন্য মায়ের কফিনের পেছনে হাজারো মানুষের সামনে হাঁটা ছিল অত্যন্ত কঠিন অভিজ্ঞতা।
এরপরই তৎকালীন প্রিন্স চার্লসের সঙ্গে তার উত্তপ্ত ফোনালাপ হয় বলে বইয়ে লিখেছেন স্পেন্সার।
বিস্ফোরক মন্তব্যের দাবি
স্পেন্সারের দাবি অনুযায়ী, ফোনালাপে চার্লস দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একপর্যায়ে তিনি এমন একটি মন্তব্য করেন, যা ডায়ানার ভাইয়ের কাছে অত্যন্ত বিস্ময়কর মনে হয়েছিল।
স্পেন্সারের বর্ণনা অনুযায়ী, চার্লস বলেছিলেন, ‘নিশ্চিন্ত থাকুন, আমরা তাকে শিগগিরই ভুলে যাব।’
স্পেন্সার লিখেছেন, তিনি কথাটি শুনে হতবাক হয়ে যান এবং কয়েক মুহূর্ত কোনো উত্তর দিতে পারেননি। পরে তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করতে পারছি না আপনি এইমাত্র এমন কথা বললেন’, এরপর ফোন রেখে দেন।
তবে এই কথোপকথনের স্বাধীন কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। ঘটনাটি প্রায় ২৯ বছর আগের এবং বর্তমানে এটি মূলত স্পেন্সারের স্মৃতিকথায় দেওয়া তার ব্যক্তিগত বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে আলোচিত হচ্ছে।
বাকিংহাম প্যালেসের বিরল প্রতিক্রিয়া
সাধারণত রাজপরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রকাশিত বইয়ের প্রতিটি দাবির জবাব দেয় না বাকিংহাম প্যালেস। কিন্তু এবার প্রাসাদ থেকে অস্বাভাবিকভাবে শক্ত অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বই নিয়ে তারা সাধারণত মন্তব্য করে না। তবে রাজা মনে করেন, ভাই বা বোনকে হারানোর শোক বহু বছর পরও মানুষের বিচারবোধ, স্মৃতি ও ঘটনাকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করতে পারে।
অর্থাৎ বাকিংহাম প্যালেস স্পেন্সারের বর্ণনার নির্ভুলতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন না তুললেও তার স্মৃতির ওপর স্পষ্ট সংশয় প্রকাশ করেছে।
ডায়ানাকে ঘিরে পুরোনো ক্ষত আবার সামনে
চার্লস স্পেন্সারের বইটি শুধু ওই একটি মন্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বইটির বিভিন্ন অংশে ডায়ানার সঙ্গে চার্লসের সম্পর্ক, তাদের বিয়ের সময়কার পরিস্থিতি এবং ১৯৯৭ সালের শেষ দিনগুলো নিয়ে স্পেন্সারের ব্যক্তিগত স্মৃতি উঠে এসেছে।
দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, বইয়ের আরও কিছু অংশে স্পেন্সার দাবি করেছেন, ডায়ানার মৃত্যুর পর রাজপরিবারের কিছু মানুষের প্রতিক্রিয়া নিয়েও তার গুরুতর প্রশ্ন ছিল। এসব দাবিও অবশ্য তার ব্যক্তিগত স্মৃতি ও ব্যাখ্যার অংশ।
স্পেন্সার বলেছেন, তিনি মূলত তার বোনকে নিয়ে প্রচলিত বিভিন্ন ‘অসত্য’ বা অসম্পূর্ণ বর্ণনার জবাব দিতে বইটি লিখেছেন। তার লক্ষ্য ডায়ানার গল্পকে নিজের ভাইয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরা।
প্রায় ৩০ বছর পরও কেন এত আলোড়ন
ডায়ানার মৃত্যু ব্রিটিশ রাজপরিবারের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি। তার সঙ্গে চার্লসের বিবাহ, বিচ্ছেদ, ক্যামিলাকে ঘিরে বিতর্ক এবং রাজপরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে বহু বই, তথ্যচিত্র ও নাট্যরূপ তৈরি হয়েছে।
কিন্তু নতুন স্মৃতিকথার দাবি সেই পুরোনো বিতর্ককে আবার ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে উইলিয়াম ও হ্যারির শৈশব, মায়ের শেষকৃত্যে তাদের ভূমিকা এবং সেই সময় রাজপরিবারের সিদ্ধান্তগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
এদিকে বইটি প্রকাশের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ। ডায়ানার মৃত্যুর ৩০তম বার্ষিকী সামনে রেখে তার জীবন ও উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
ফলে স্পেন্সারের স্মৃতিকথা প্রকাশের আগেই তা ব্রিটিশ রাজপরিবারের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি আবার সামনে নিয়ে এসেছে। তবে চার্লস সত্যিই ওই মন্তব্য করেছিলেন কি না, তা নিশ্চিত করার মতো স্বাধীন প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে নেই। বিষয়টি আপাতত স্পেন্সারের ব্যক্তিগত স্মৃতির দাবি এবং বাকিংহাম প্যালেসের পাল্টা বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
