ইউরোপের আকাশপথে নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একের পর এক যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে বোমা হামলার হুমকি পাওয়ায় কয়েকটি দেশের বিমানবন্দরে জরুরি নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। কোনো উড়োজাহাজকে মাঝপথে অন্য বিমানবন্দরে অবতরণ করতে হয়েছে, কোথাও আবার যাত্রীদের নামিয়ে তল্লাশি চালানো হয়েছে। এমনকি কয়েকটি উড়োজাহাজকে পাহারা দিয়ে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছে যুদ্ধবিমান। ধারাবাহিক এসব হুমকির কারণে ইউরোপের বিমান চলাচল ব্যবস্থায় নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
৬ নভেম্বরও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বিমান সংস্থা ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ নতুন করে বোমার হুমকির খবর পেয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিবহনবিষয়ক কমিশনার আপোস্তোলোস তজিৎসিকোস্তাস জানিয়েছেন, ওই দিন ১১টি উড়োজাহাজে বোমার হুমকি পাওয়া যায়। এর আগের দিন বৃহস্পতিবার ১৪টি এবং মঙ্গলবার সাতটি উড়োজাহাজকে একই ধরনের হুমকির মুখে পড়তে হয়েছিল। অর্থাৎ কয়েক দিনের ব্যবধানে ইউরোপের আকাশপথে এমন হুমকির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
যুদ্ধবিমানের পাহারায় যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ
সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ৫ নভেম্বর। হুমকি পাওয়ার পর ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কি থেকে ইতালির রোমগামী একটি ফিনএয়ার উড়োজাহাজকে সামরিক যুদ্ধবিমান পাহারা দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। একই দিনে আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন থেকে রোমগামী অ্যার লিঙ্গাসের একটি উড়োজাহাজকে ফ্রান্সের একটি সামরিক বিমানঘাঁটিতে সরিয়ে নেওয়া হয়। ফরাসি যুদ্ধবিমান উড়োজাহাজটিকে পথ দেখিয়ে সেখানে নিয়ে যায়। পরে যাত্রীদের নামিয়ে নিরাপত্তা তল্লাশি চালানো হয়।
বুলগেরিয়ার রাজধানী সোফিয়াগামী রায়ানএয়ারের তিনটি উড়োজাহাজও হুমকির মুখে পড়ে। ডেনমার্ক, মাদ্রিদ ও লন্ডন থেকে আসা এসব উড়োজাহাজের কয়েকটিকে বুলগেরিয়ার যুদ্ধবিমান পাহারা দেয়। লন্ডন থেকে আসা একটি উড়োজাহাজকে আবার প্লভদিভে অবতরণ করানো হয়।
এ ছাড়া প্যারিস, প্রাগ, ব্রাসেলস, মিলান ও ভিয়েনাগামী একাধিক ফ্লাইটেও নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়। কোথাও উড়োজাহাজের তল্লাশি চালানো হয়েছে, কোথাও আবার সাময়িকভাবে বিমানবন্দরের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটেছে।
তল্লাশিতে মেলেনি বিস্ফোরক
এতগুলো হুমকি পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো উড়োজাহাজে বিস্ফোরক কিংবা সন্দেহজনক বস্তু পাওয়া যায়নি। সব কটি উড়োজাহাজই শেষ পর্যন্ত নিরাপদে অবতরণ করেছে। তবে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো প্রতিটি হুমকিকেই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
কারণ, বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে একটি হুমকিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। হুমকিটি ভুয়া হলেও সেটি যাচাই করতে উড়োজাহাজ সরিয়ে নেওয়া, যাত্রীদের নামানো, নিরাপত্তা তল্লাশি এবং প্রয়োজনে যুদ্ধবিমান মোতায়েন করতে হয়। এতে বিমান সংস্থার আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়।
ইউরোপীয় বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ইউরোকন্ট্রোলের হিসাবে, ৫ নভেম্বর ইউরোপের আকাশে প্রায় ২৬ হাজার ৩০০টি ফ্লাইট পরিচালিত হয়েছিল। সেদিন হুমকির মুখে পড়া ফ্লাইটের সংখ্যা মোট চলাচলের তুলনায় খুবই সামান্য। কিন্তু অল্পসংখ্যক উড়োজাহাজকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হুমকি দেওয়ার ঘটনাই নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে ভাবিয়ে তুলেছে।
বিমানবন্দরের বাইরেও ছড়াচ্ছে আতঙ্ক
উদ্বেগের বিষয় হলো, হুমকির ঘটনা শুধু উড়োজাহাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। ইউরোপের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়েও বোমা হামলার হুমকি পাঠানো হয়েছে। আয়ারল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আরটিইর কার্যালয় সাময়িকভাবে খালি করে দেওয়া হয়। যুক্তরাজ্যের স্কাই এবং বুলগেরিয়ার নোভা টেলিভিশনও নিরাপত্তা হুমকির কথা জানিয়েছে।
এতে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, কোনো গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে কি না। বিমানবন্দর, সংবাদমাধ্যম, পরিবহনব্যবস্থা ও অন্যান্য জরুরি পরিষেবায় একযোগে আতঙ্ক সৃষ্টি করা গেলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হতে পারে।
রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে জল্পনা, প্রমাণ মেলেনি
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক সময়ে সাইবার হামলা, নাশকতা এবং ড্রোন অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার কিছু ক্ষেত্রে রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছে পশ্চিমা দেশগুলো। ফলে নতুন বোমা হুমকিগুলোর পেছনেও কোনো সমন্বিত তৎপরতা রয়েছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
কিছু হুমকিবার্তায় রাশিয়ার একটি নিষিদ্ধ উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর নাম ব্যবহারের কথাও সামনে এসেছে। তবে কোনো রাষ্ট্র বা সংগঠনকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে দায়ী করা হয়নি। রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতারও কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ব্যক্তিগত প্রতিশোধ, অনুকরণমূলক তৎপরতা কিংবা পরিকল্পিত হাইব্রিড হামলা—সব সম্ভাবনাই খতিয়ে দেখছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
নিরাপত্তা জোরদারে বৈঠকে বসছে ইউরোপ
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিবহন কমিশনার জানিয়েছেন, বিমান চলাচল ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা আগামী সপ্তাহে ব্রাসেলসে বৈঠকে বসবেন। সেখানে বিমানবন্দর, বিমান সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হবে।
ইউরোপের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিমান চলাচলে স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় রাখা। কারণ, ধারাবাহিক হুমকির কারণে প্রতিটি ফ্লাইটে অতিরিক্ত সতর্কতা আরোপ করতে হলে বিমান পরিবহন খরচ ও যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়বে।
সব মিলিয়ে, ইউরোপের আকাশে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নতুন ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিস্ফোরক না পাওয়া গেলেও হুমকির পুনরাবৃত্তি দেখিয়ে দিয়েছে, বেসামরিক বিমান চলাচলকে অচল করে দিতে বাস্তব হামলার প্রয়োজন হয় না; পরিকল্পিত আতঙ্কও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
