দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কম মজুরি, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং সরকারি সেবার সংকোচন—সব মিলিয়ে ফ্রান্সে জনঅসন্তোষ নতুন মাত্রা পেয়েছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে এবার যোগ দিয়েছেন শ্রমিক, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং বিভিন্ন পেশাজীবী। ৫ নভেম্বর দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ ও ধর্মঘটে লাখ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছেন। কোথাও রাস্তায় নেমেছে বিশাল মিছিল, কোথাও বন্ধ হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবহনসেবা। সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে আন্দোলনকারীরা বলছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও সাধারণ মানুষের আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বৃহস্পতিবারের বিক্ষোভে সারা দেশে ছয় লাখের বেশি মানুষ অংশ নেন। তবে দেশটির প্রভাবশালী শ্রমিক সংগঠন সিজিটি দাবি করেছে, ২০০টির বেশি কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১৬ লাখ। রাজধানী প্যারিসে শ্রমিক ও শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও মিছিলে যোগ দেন।
আগের ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভের তুলনায় এবারের অংশগ্রহণ অনেক বেশি ছিল। এতে স্পষ্ট হয়েছে, আন্দোলনটি আর শুধু শিক্ষার্থীদের দাবি কিংবা নির্দিষ্ট কোনো পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
দ্রব্যমূল্য বাড়ছে, আয় বাড়ছে না
ফ্রান্সে সাম্প্রতিক অসন্তোষের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্য আয়ের পরিবারগুলো চাপে পড়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেও মজুরি ও পেনশন সেই অনুপাতে বাড়ানো হচ্ছে না।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর যৌথ বক্তব্যে বলা হয়েছে, জ্বালানি থেকে শুরু করে খাবার ও বাসাভাড়া—সবকিছুর দাম বাড়ছে, কিন্তু মানুষের আয় বাড়ছে না। একই সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা এবং অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কাও সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
আন্দোলনকারীদের দাবি, শুধু বেতন বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, পেনশনের সুরক্ষা, কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং সরকারি সেবায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যুক্ত হলো শ্রমিক সংগঠন
ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল গত সেপ্টেম্বর মাসে। রাজধানী প্যারিসের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও কর্মীসংকট এবং শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ থেকে আন্দোলনের সূত্রপাত। পরে তা বিভিন্ন শহরের স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ে।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব রয়েছে। উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর চাকরি পাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। ফলে তাঁদের কাছে শিক্ষার মান ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান একই সংকটের অংশ হয়ে উঠেছে।
এই আন্দোলনের সঙ্গে এবার শ্রমিক সংগঠনগুলো একাত্মতা প্রকাশ করেছে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের একাধিক ইউনিয়ন ধর্মঘটের ডাক দেয়। রেল, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে কর্মীরা আন্দোলনে অংশ নেন।
পরিবহন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অচলাবস্থা
বিক্ষোভের প্রভাব পড়েছে দেশের স্বাভাবিক জনজীবনে। বিভিন্ন এলাকায় গণপরিবহন চলাচল ব্যাহত হয়েছে। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ উচ্চবিদ্যালয় বন্ধ ছিল অথবা স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেনি। কোথাও শিক্ষার্থীদের অবরোধ, কোথাও শিক্ষকদের ধর্মঘটের কারণে পাঠদান বন্ধ থাকে।
নিরাপত্তার কারণে প্যারিসের বিখ্যাত আইফেল টাওয়ারও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। দিন শেষে অন্তত ৪৪৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। কয়েকটি শহরে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধস্তাধস্তি, সড়ক অবরোধ এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।
তবে রাজধানী প্যারিসের প্রধান মিছিলটি মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ছিল। আন্দোলনকারীদের বড় অংশের দাবি ছিল অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও সামাজিক নিরাপত্তা।
সরকারের ওপর বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছেন। ৯ নভেম্বর শ্রমিক সংগঠন ও নিয়োগকর্তাদের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সামাজিক সম্মেলনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
তবে আন্দোলনকারীদের একাংশ মনে করছে, শুধু বৈঠক করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা যথেষ্ট নয়। তাঁরা সরকারের কাছ থেকে মজুরি, পেনশন, শিক্ষা ও সরকারি সেবার বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত চান।
রাজনৈতিকভাবেও আন্দোলনটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিক্ষোভের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান যুক্ত করার চেষ্টা করছে। প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ আরেক মেয়াদে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। ফলে তাঁর উত্তরসূরি কে হবেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক তৎপরতা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।
আন্দোলন কি আরও বড় হবে?
ফ্রান্সের সাম্প্রতিক বিক্ষোভের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এতে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের অংশগ্রহণ। শিক্ষার্থীদের শিক্ষার দাবি, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়—সবগুলো বিষয় একই আন্দোলনের অংশ হয়ে উঠেছে।
৭ নভেম্বর আরও বিক্ষোভের কর্মসূচি রয়েছে। আন্দোলনকারীরা বলছেন, সরকারের কাছ থেকে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ না এলে তাঁরা রাজপথ ছাড়বেন না।
ফ্রান্সের সামনে এখন বড় প্রশ্ন, অর্থনৈতিক অসন্তোষকে রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হওয়া থেকে সরকার কীভাবে ঠেকাবে। কারণ, আন্দোলন যত বিস্তৃত হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে সমস্যাটি শুধু দ্রব্যমূল্যের নয়; বরং মানুষের ভবিষ্যৎ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার সঙ্গেও জড়িত।
