জাপানের রাজধানী টোকিওর উপকূলের কাছে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় রিখটার স্কেলে ৬ দশমিক ১ মাত্রার এই কম্পন অনুভূত হয় কানতো অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায়। তবে ভূমিকম্পের পর সুনামির কোনো সতর্কতা জারি করেনি জাপানের আবহাওয়া সংস্থা। তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবরও পাওয়া যায়নি।
জাপানের আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা ৩৯ মিনিটে সমুদ্রের নিচে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এর উৎপত্তিস্থল ছিল টোকিওর পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের কাছাকাছি কানতো অঞ্চলের সমুদ্রসীমায়। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার হিসাবে, ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল টোকিওর পূর্বদিকে অবস্থিত আসাহি শহর থেকে প্রায় ১৬৯ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে।
কম্পন অনুভূত হয়েছে উপকূলীয় এলাকায়
জাপানের আবহাওয়া সংস্থা দেশটির নিজস্ব সাত ধাপের ভূমিকম্প তীব্রতা পরিমাপক স্কেলে কম্পনের মাত্রা ৩ হিসেবে রেকর্ড করেছে। এই মাত্রায় সাধারণত ঘরের ভেতরে থাকা বেশির ভাগ মানুষ কম্পন অনুভব করেন। তাক বা আলমারিতে রাখা থালা-বাসন কেঁপে উঠতে পারে, তবে সাধারণত বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয় না।
ভূমিকম্পটির কেন্দ্র সমুদ্রের নিচে হওয়ায় রাজধানী টোকিওর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে—এমন কোনো তাৎক্ষণিক তথ্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিল। ভবন, সড়ক, রেলপথ ও অন্যান্য অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
ভূমিকম্পের মাত্রা ৬-এর বেশি হওয়ায় ঘটনাটি স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে ভূমিকম্পের মাত্রা একাই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে না। উৎপত্তিস্থলের গভীরতা, জনবসতি থেকে দূরত্ব, ভূকম্পনের প্রকৃতি এবং ভবনের নির্মাণমান—সবকিছু মিলিয়ে এর প্রভাব নির্ধারিত হয়।
সুনামি সতর্কতা কেন জারি হয়নি
সমুদ্রের নিচে ভূমিকম্প হলে সুনামির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। তবে প্রতিটি সামুদ্রিক ভূমিকম্প সুনামি সৃষ্টি করে না। সাধারণত সমুদ্রতলের বড় ধরনের উল্লম্ব স্থানচ্যুতি হলে বিপুল পরিমাণ পানি সরে গিয়ে সুনামির ঢেউ তৈরি হতে পারে।
শুক্রবারের ভূমিকম্পের পর জাপানের আবহাওয়া সংস্থা কোনো সুনামি সতর্কতা জারি করেনি। অর্থাৎ কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক মূল্যায়নে উপকূলীয় এলাকায় বিপজ্জনক ঢেউ আঘাত হানার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তবে জাপানে ভূমিকম্পের পর সমুদ্রের অবস্থা ও উপকূলীয় পর্যবেক্ষণ নিয়মিতভাবে চালানো হয়।
ভূমিকম্পপ্রবণ জাপান
জাপান বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ। প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলে দেশটির অবস্থান। এখানে একাধিক বৃহৎ টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থল রয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয়, ফিলিপাইন সাগরীয়, ইউরেশীয় ও উত্তর আমেরিকান প্লেটের পারস্পরিক চলাচলের কারণে জাপানে প্রায়ই ভূমিকম্প হয়।
দেশটিতে বছরে শত শত ছোট-বড় কম্পন অনুভূত হয়। বিশ্বের মোট ভূমিকম্পের উল্লেখযোগ্য অংশও এই অঞ্চলে ঘটে। অধিকাংশ ভূমিকম্পে বড় ক্ষতি না হলেও কখনো কখনো শক্তিশালী কম্পন ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ধ্বংস ডেকে আনে।
২০১১ সালের ১১ মার্চ জাপানের উত্তর-পূর্ব উপকূলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প ও পরবর্তী সুনামিতে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। ওই দুর্যোগে ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। সেই অভিজ্ঞতার পর দেশটি ভূমিকম্প ও সুনামি মোকাবিলায় সতর্কতা ব্যবস্থা, ভবন নির্মাণের মান এবং জরুরি সাড়াদান সক্ষমতা আরও জোরদার করেছে।
নিরাপত্তা প্রস্তুতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ
জাপানে ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় ভবন নির্মাণে কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়। অনেক ভবন এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে শক্তিশালী কম্পনেও কাঠামো সহজে ভেঙে না পড়ে। রেল ও পরিবহনব্যবস্থায় ভূমিকম্প শনাক্ত হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গতি কমানো বা চলাচল বন্ধ করার ব্যবস্থাও রয়েছে।
দেশটির নাগরিকদের নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া, জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র সম্পর্কে ধারণা এবং দুর্যোগকালীন প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। ভূমিকম্পের পর আফটারশক বা পরবর্তী কম্পনের আশঙ্কা থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে প্রবেশ না করা এবং কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আপাতত স্বস্তি, তবে পর্যবেক্ষণ অব্যাহত
শুক্রবারের ভূমিকম্পের পর সুনামি সতর্কতা না থাকায় উপকূলীয় বাসিন্দাদের জন্য তাৎক্ষণিক ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম ছিল। বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর না আসাও স্বস্তির বিষয়। তবে ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে একটি শক্তিশালী কম্পনের পর পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায় না।
জাপানের কর্তৃপক্ষের জন্য এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো সম্ভাব্য পরবর্তী কম্পন, অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং সমুদ্রের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা। টোকিওর কাছাকাছি এই ভূমিকম্প আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, উন্নত প্রযুক্তি ও প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও জাপানের জন্য ভূমিকম্পের ঝুঁকি একটি স্থায়ী বাস্তবতা।
