জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষার সমন্বয় ঘটাতে নতুন আঞ্চলিক উদ্যোগ নিয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ান। এ উদ্যোগে নেতৃত্ব দিচ্ছে ফিলিপাইন। দেশটি আসিয়ানের সবুজ অর্থনীতি কাঠামো বা গ্রিন ইকোনমি ফ্রেমওয়ার্ক অ্যাগ্রিমেন্ট তৈরির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছে। লক্ষ্য, শিল্প ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য একটি অভিন্ন সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করা।
ফিলিপাইনের জলবায়ু পরিবর্তন কমিশন আসিয়ানের কার্বন নিরপেক্ষতা টাস্কফোর্সের সভাপতি হিসেবে এ উদ্যোগে সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে প্রস্তাবিত কাঠামোর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রাথমিক প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এখনো এটি চূড়ান্ত চুক্তি নয়; বরং সদস্যদেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্র ও বাস্তবায়নযোগ্যতা নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলছে।
সবুজ অর্থনীতির কাঠামো কেন প্রয়োজন
আসিয়ানের সদস্যদেশগুলোর অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। উৎপাদনশিল্প, বিদ্যুৎ, পরিবহন, নির্মাণ ও বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধির সঙ্গে জ্বালানির চাহিদাও বাড়ছে। এসব খাতের বড় অংশ এখনো জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ ও পরিবেশদূষণের চাপও বাড়ছে।
সবুজ অর্থনীতি কাঠামোর মূল লক্ষ্য হলো, দেশগুলোর উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশগত বিষয়কে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব শিল্প, টেকসই অর্থায়ন এবং কম কার্বন নিঃসরণকারী বাণিজ্যব্যবস্থার প্রসার ঘটতে পারে।
প্রস্তাবিত কাঠামো বাস্তবায়িত হলে সদস্যদেশগুলো একে অপরের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারবে। একই সঙ্গে সবুজ শিল্পে বিনিয়োগ এবং পরিবেশবান্ধব পণ্য উৎপাদনে আঞ্চলিক বাজার গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
চারটি ক্ষেত্রে সহযোগিতার সম্ভাবনা
ফিলিপাইনের নেতৃত্বে চলমান সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে টেকসই অর্থায়ন, পরিবেশবান্ধব পণ্য, জলবায়ু-সম্পর্কিত বাণিজ্যনীতি এবং অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা।
টেকসই অর্থায়নের ক্ষেত্রে সবুজ প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য অর্থের প্রবাহ বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎকেন্দ্র, পরিচ্ছন্ন পরিবহন, জ্বালানি সাশ্রয়ী ভবন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন প্রয়োজন। আঞ্চলিক সহযোগিতা থাকলে এসব প্রকল্পের জন্য বিনিয়োগ আকর্ষণ সহজ হতে পারে।
পরিবেশবান্ধব পণ্যের বাজার সম্প্রসারণও গুরুত্বপূর্ণ। সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম, বৈদ্যুতিক যানবাহনের যন্ত্রাংশ, জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণের উৎপাদন ও বাণিজ্য বাড়ানো গেলে নতুন শিল্পের সুযোগ তৈরি হবে।
এ ছাড়া কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যনীতিতে যে পরিবর্তন আসছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। বিশেষ করে রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য পরিবেশগত মান ও কার্বন হিসাবের বিষয়টি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর সক্ষমতার পার্থক্য
আসিয়ানের সব দেশ অর্থনৈতিকভাবে একই অবস্থানে নেই। সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত অর্থনীতি এবং লাওস, কম্বোডিয়া বা মিয়ানমারের মতো উন্নয়নশীল দেশের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় বড় পার্থক্য রয়েছে। ফলে সবার জন্য একই ধরনের পরিবেশগত শর্ত আরোপ করলে কিছু দেশের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
ফিলিপাইনের জলবায়ু পরিবর্তন কমিশনের কর্মকর্তারা এ কারণেই অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামোর ওপর জোর দিচ্ছেন। তাঁদের মতে, প্রস্তাবিত চুক্তিতে প্রতিটি দেশের নিজস্ব বাস্তবতা, উন্নয়নের অগ্রাধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বিবেচনা করতে হবে।
প্রযুক্তিগত সহায়তা, প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সহজ শর্তে অর্থায়নের ব্যবস্থা করা গেলে তুলনামূলক কম সক্ষম দেশগুলোর জন্যও সবুজ অর্থনীতিতে রূপান্তর সহজ হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান আঞ্চলিক উদ্যোগের সঙ্গে নতুন কাঠামোর কাজের পুনরাবৃত্তি এড়ানো জরুরি।
ফিলিপাইনের নেতৃত্বের তাৎপর্য
ফিলিপাইন নিজেও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর একটি। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উপকূলীয় ক্ষয় দেশটির অর্থনীতি ও জনজীবনে প্রভাব ফেলে। তাই জলবায়ু অভিযোজন ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিষয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতা দেশটির জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
আসিয়ানের কার্বন নিরপেক্ষতা টাস্কফোর্সের নেতৃত্ব দেওয়ার মাধ্যমে ফিলিপাইন আঞ্চলিক আলোচনায় নিজের ভূমিকা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশটির জাতীয় জলবায়ু লক্ষ্যের সঙ্গেও উদ্যোগটিকে যুক্ত করতে চাইছে। সবুজ শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ হলে দেশটির অর্থনীতিতেও সুফল আসতে পারে।
চুক্তি বাস্তবায়নের পথে চ্যালেঞ্জ
সবুজ অর্থনীতির কাঠামো তৈরি করা সহজ হলেও তা বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে। সদস্যদেশগুলোর জ্বালানি নীতি, শিল্প কাঠামো, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং পরিবেশগত বিধিমালায় পার্থক্য রয়েছে। কয়লা ও গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎব্যবস্থা থেকে দ্রুত সরে আসা অনেক দেশের পক্ষে কঠিন। আবার নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন বড় অঙ্কের অর্থ ও প্রযুক্তি।
তাই প্রস্তাবিত কাঠামোর সফলতা নির্ভর করবে সদস্যদেশগুলোর সম্মতি, বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ এবং অর্থায়নের ওপর। চলমান সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে এসব বিষয়ই মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
ফিলিপাইনের নেতৃত্বে আসিয়ানের সবুজ অর্থনীতি উদ্যোগ এখন প্রাথমিক পর্যায়ে। তবে এটি সফল হলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জন্য পরিবেশবান্ধব প্রবৃদ্ধির একটি অভিন্ন পথ তৈরি হতে পারে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জলবায়ু সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য আনার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
