ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফার ভোট আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ দূরে। ৪ অক্টোবরের ভোটকে সামনে রেখে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গন এখন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় উত্তপ্ত। একদিকে বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা, অন্যদিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে ও সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। তবে এই লড়াইয়ে এমন একজনও রয়েছেন, যিনি ব্যালটে নেই—কিন্তু নির্বাচনী সমীকরণে তাঁর উপস্থিতি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
তিনি জইর বলসোনারো।
২০২৬ সালের নির্বাচনে নিজে প্রার্থী হতে পারছেন না সাবেক এই প্রেসিডেন্ট। বরং আদালতের রায়, গৃহবন্দিত্ব এবং রাজনৈতিক বিধিনিষেধের মধ্যেও তাঁর নাম ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারই এখন ডানপন্থী শিবিরের অন্যতম প্রধান শক্তি। বিশেষ করে ছেলে ফ্লাভিওর প্রচারণায় তাঁর প্রভাব নিয়ে ব্রাজিলের রাজনীতিতে আলোচনা তুঙ্গে।
প্রার্থী না হয়েও কেন এত গুরুত্বপূর্ণ বলসোনারো?
২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে পরাজয়ের পর ব্রাজিলের রাজনীতিতে বলসোনারো একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিণত হয়েছেন। তাঁর সমর্থকদের বড় একটি অংশ এখনো তাঁকে ডানপন্থী রাজনীতির প্রধান প্রতীক হিসেবে দেখে।
কিন্তু ২০২৬ সালের নির্বাচনে সেই পরিচয় সরাসরি ব্যালটে ব্যবহার করার সুযোগ নেই। ব্রাজিলের নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ আগেই তাঁকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করেছিল। পরে ২০২২ সালের নির্বাচনের ফল উল্টে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের মামলায় তিনি ২৭ বছরের বেশি কারাদণ্ড পান। বর্তমানে স্বাস্থ্যগত কারণে তিনি গৃহবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। আদালতের আদেশ অনুযায়ী তাঁর রাজনৈতিক যোগাযোগের ওপরও কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে।
ফলে তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব এখন মূলত পরোক্ষ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম তাঁর ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারো।
ফ্লাভিওর প্রচারণায় বাবার ছায়া
ফ্লাভিও বলসোনারো এবার ডানপন্থী শিবিরের প্রধান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে উঠে এসেছেন। তাঁর প্রচারণায় বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
জুলাইয়ে ফ্লাভিওর প্রচারণা শুরুর অনুষ্ঠানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে জইর বলসোনারোর একটি ভার্চুয়াল অবতারও দেখানো হয়েছিল। সেখানে সাবেক প্রেসিডেন্ট তাঁর ছেলেকে সমর্থনের বার্তা দেন। ঘটনাটি দ্রুত বিতর্ক সৃষ্টি করে এবং নির্বাচনী প্রচারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে ব্রাজিলের নির্বাচন কমিশনের সামনে নতুন প্রশ্ন তোলে।
এরপর সেপ্টেম্বরের শুরুতে ব্রাজিলের সুপিরিয়র ইলেক্টোরাল কোর্ট এ ধরনের কনটেন্ট নিয়ে নিয়ম আরও স্পষ্ট করার উদ্যোগ নেয়। আদালত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বা পরিবর্তিত রাজনৈতিক কনটেন্টের ক্ষেত্রে কীভাবে নিয়ম প্রযোজ্য হবে, সে বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছে।
অর্থাৎ, সরাসরি প্রচারে অংশ নিতে না পারলেও জইর বলসোনারোর রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রতীকী উপস্থিতি ফ্লাভিওর প্রচারণায় জায়গা করে নিচ্ছে।
ভোটের হিসাবেও দেখা যাচ্ছে বলসোনারো পরিবারের প্রভাব
সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলো নির্বাচনের উত্তাপ আরও বাড়িয়েছে।
১৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ডেটাফোলহা জরিপ অনুযায়ী, সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার লড়াইয়ে লুলা ৪৬ শতাংশ এবং ফ্লাভিও বলসোনারো ৪৪ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন। জরিপটির ভুলসীমা ২ শতাংশ পয়েন্ট হওয়ায় ব্যবধানটি পরিসংখ্যানগতভাবে সমতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রথম দফার সম্ভাব্য ভোটেও লুলা ৩৯ শতাংশ এবং ফ্লাভিও ৩৬ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন।
এর আগে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি BTG Pactual/Nexus ও Quaest-এর জরিপেও দুই শিবিরের মধ্যে খুব কাছাকাছি লড়াইয়ের চিত্র উঠে আসে। একটি জরিপে দ্বিতীয় দফায় লুলা সামান্য এগিয়ে ছিলেন, অন্যটিতে ফ্লাভিও সংখ্যাগতভাবে এগিয়ে ছিলেন।
এই ফলাফলগুলো থেকে অন্তত এটুকু স্পষ্ট যে, বলসোনারো পরিবারের রাজনৈতিক ভিত্তি এখনো নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান।
আদালত, বলসোনারো ও নির্বাচনী প্রচারণা
এবারের নির্বাচনে বলসোনারোর প্রভাব শুধু তাঁর জনপ্রিয়তা বা পারিবারিক রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। আদালত ও বিচারব্যবস্থা নিয়েও তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে।
বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আলেকজান্দ্রে দে মোরায়েসকে ঘিরে সাম্প্রতিক একটি ব্যাংকিং-সংক্রান্ত তদন্ত নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করেছে। মোরায়েসই বলসোনারোর বিরুদ্ধে হওয়া গুরুত্বপূর্ণ তদন্ত ও মামলায় বড় ভূমিকা রেখেছেন।
ফ্লাভিও ও তাঁর সমর্থকেরা এই ইস্যুটিকে প্রচারণায় তুলে ধরছেন। অন্যদিকে মোরায়েস বলেছেন, তাঁকে ঘিরে তদন্তের দাবি রাজনৈতিক ও নির্বাচনী উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলো নিয়ে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া এখনো চলমান।
ফলে সাবেক প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে হওয়া বিচারিক পদক্ষেপ এবং ব্রাজিলের বিচারব্যবস্থাকে ঘিরে বিতর্কও নির্বাচনী আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।
ফ্লাভিও কি বাবার ভোটব্যাংক ধরে রাখতে পারছেন?
এটাই এবারের নির্বাচনের অন্যতম বড় প্রশ্ন।
ফ্লাভিও বলসোনারো তাঁর বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করছেন, কিন্তু একই সঙ্গে তাঁকে নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ও তৈরি করতে হচ্ছে। প্রথম দিকের প্রচারণায় তিনি নিজেকে বাবার তুলনায় বেশি সংলাপনির্ভর ও সমঝোতামুখী হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। পরে প্রচারণা যত এগিয়েছে, ততই তাঁর বক্তব্যে বলসোনারো পরিবারের প্রচলিত ডানপন্থী অবস্থানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা দেখা গেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে লুলার শিবিরও বলসোনারো পরিবারের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছে। ফলে নির্বাচনটি কেবল লুলা বনাম ফ্লাভিওর প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়; অনেক ভোটারের কাছে এটি লুলা ও বলসোনারো পরিবারের রাজনৈতিক ধারার মধ্যকার বৃহত্তর প্রতিযোগিতার রূপও নিচ্ছে।
শেষ মুহূর্তে বলসোনারোর ভূমিকা কোথায়?
নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, জইর বলসোনারোর প্রত্যক্ষ ভূমিকা তত সীমিত। গৃহবন্দিত্ব ও আদালতের বিধিনিষেধ তাঁকে প্রচলিত রাজনৈতিক প্রচারণা থেকে দূরে রেখেছে। এমনকি তাঁর লেখা একটি চিঠি ছেলে ফ্লাভিওর প্রচারণায় প্রকাশের পরও আদালত তাঁর রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল।
তবে রাজনীতিতে প্রভাব সবসময় মঞ্চে উপস্থিত থাকার ওপর নির্ভর করে না। বলসোনারোর ক্ষেত্রে তাঁর নাম, রাজনৈতিক পরিচয়, সমর্থকগোষ্ঠী এবং পরিবারের প্রতি আনুগত্য—সবকিছু মিলিয়ে তিনি এখনো নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।
অন্যদিকে ফ্লাভিওর বর্তমান অবস্থানও দেখাচ্ছে যে সেই প্রভাব কতটা ভোটে রূপান্তরিত হবে, সেটিই আসল প্রশ্ন। সাম্প্রতিক জরিপে লুলা ও ফ্লাভিওর ব্যবধান খুব কম হওয়ায় আগামী সপ্তাহগুলোতে বলসোনারো পরিবারের রাজনৈতিক প্রভাব আরও স্পষ্টভাবে পরীক্ষিত হবে।
৪ অক্টোবরের প্রথম দফার ভোটে কোনো প্রার্থী বৈধ ভোটের ৫০ শতাংশের বেশি না পেলে শীর্ষ দুই প্রার্থী ২৫ অক্টোবরের দ্বিতীয় দফায় মুখোমুখি হবেন। ফলে প্রথম দফায় বলসোনারো পরিবারের সমর্থন কতটা ভোটে রূপ নেয় এবং দ্বিতীয় দফায় অন্য প্রার্থীদের ভোট কোন দিকে যায়—দুই বিষয়ই ব্রাজিলের নির্বাচনের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
