দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ফুটবলে আসছে নতুন অধ্যায়। প্রথমবারের মতো আয়োজিত হচ্ছে ফিফা আসিয়ান কাপ। ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা ও বান্দুং এবং হংকংয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে ১৪টি দল।
২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত চলা এই টুর্নামেন্টকে শুধু ফুটবল প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখছেন না আয়োজকেরা। তাদের কাছে এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নতুন ধরনের ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক ও আঞ্চলিক যোগাযোগ তৈরির একটি সুযোগ।
ফিফার ছাতার নিচে আসিয়ান
আসিয়ান অঞ্চলে ফুটবল বরাবরই জনপ্রিয়। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, মিয়ানমারসহ দেশগুলোর মধ্যে ফুটবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বহু পুরোনো।
কিন্তু ফিফার সরাসরি সম্পৃক্ততায় নতুন এই প্রতিযোগিতা আঞ্চলিক ফুটবলকে আরও আন্তর্জাতিক পরিচিতি দেওয়ার সুযোগ তৈরি করছে।
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো প্রতিযোগিতাটিকে এমন একটি মঞ্চ হিসেবে তুলে ধরেছেন, যেখানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ পাবে।
ইন্দোনেশিয়াই কেন কেন্দ্র
বিশাল জনসংখ্যা ও ফুটবলের প্রতি ব্যাপক আগ্রহের কারণে ইন্দোনেশিয়া এই টুর্নামেন্টের অন্যতম প্রধান আয়োজক। জাকার্তা ও বান্দুংয়ে ম্যাচ আয়োজনের প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই জোরদার হয়েছে।
রাজধানী জাকার্তা নিরাপত্তা, পরিবহন ও দর্শকদের চলাচলকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। উদ্বোধনের আগে শহরে প্রচার, ক্রীড়া অনুষ্ঠান ও সমর্থকদের অংশগ্রহণও বাড়ছে।
ইন্দোনেশিয়ার জন্য এটি ক্রীড়া আয়োজনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে নিজেদের সক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ।
ফুটবল কি আসিয়ান পরিচয় শক্ত করবে
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সবসময় এক নয়। চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতা, দক্ষিণ চীন সাগর, বাণিজ্য, অভিবাসন ও নিরাপত্তার মতো বিষয়ে সদস্য দেশগুলোর অবস্থান ভিন্ন।
কিন্তু ফুটবল এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে সাধারণ মানুষ তুলনামূলক সহজে একটি আঞ্চলিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
ইন্দোনেশিয়ার একজন সমর্থক ভিয়েতনাম বা থাইল্যান্ডের দলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন, কিন্তু একই সঙ্গে তারা নিজেদের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অংশ হিসেবেও দেখতে পারেন।
এই দ্বৈত পরিচয়ই আসিয়ানকে আরও দৃঢ় সাংস্কৃতিক ভিত্তি দিতে পারে।
খেলার বাইরেও বড় অর্থনীতি
একটি বড় আন্তর্জাতিক ফুটবল আয়োজনের প্রভাব মাঠের বাইরে আরও বিস্তৃত। হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, পর্যটন, সম্প্রচার, বিজ্ঞাপন ও স্থানীয় ব্যবসায় এর প্রভাব পড়ে।
বিদেশি দর্শক ও সমর্থকরা ইন্দোনেশিয়ায় এলে স্থানীয় অর্থনীতিতে অতিরিক্ত আয় তৈরি হতে পারে।
একই সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন শহরকে আন্তর্জাতিক দর্শকদের সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়।
প্রতিদ্বন্দ্বিতা কি ঐক্যকে ছাপিয়ে যাবে
ফুটবলে আবেগ তীব্র। তাই জাতীয় দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা কখনো কখনো রাজনৈতিক বা সামাজিক উত্তেজনাও তৈরি করতে পারে।
তবে আয়োজকদের লক্ষ্য হলো এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ইতিবাচক ক্রীড়া সংস্কৃতিতে পরিণত করা। ফিফার সম্পৃক্ততা এবং একাধিক দেশের অংশগ্রহণ প্রতিযোগিতাটিকে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক মঞ্চে পরিণত করতে পারে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য এটি তাই শুধু নতুন কাপ জয়ের লড়াই নয়। যদি টুর্নামেন্টটি নিয়মিত আয়োজন করা যায় এবং দেশগুলোর সমর্থকদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ে, তাহলে ফুটবল আসিয়ানের জন্য একটি নতুন ‘সফট পাওয়ার’ হয়ে উঠতে পারে।
অর্থনীতি ও রাজনীতির বাইরে মানুষের আবেগকে এক জায়গায় আনার ক্ষমতা ফুটবলের রয়েছে। সেই শক্তিকে কাজে লাগাতে পারলে প্রথম ফিফা আসিয়ান কাপ হয়তো ভবিষ্যতে একটি টুর্নামেন্টের চেয়েও বড় কিছু হয়ে উঠবে—দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নতুন আঞ্চলিক পরিচয়ের একটি প্রতীক।
