গাজায় যুদ্ধের ক্ষত শুধু ধ্বংস হওয়া ভবন আর বিধ্বস্ত রাস্তায় থেমে নেই—এখন পানির প্রতিটি ফোঁটা হয়ে উঠেছে জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। ভেঙে পড়া পানির পাইপলাইন, অচল নলকূপ ও লবণমুক্তকরণ কেন্দ্রের পাশাপাশি ধসে পড়েছে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা। ফলে একদিকে মানুষ পর্যাপ্ত পানি পাচ্ছে না, অন্যদিকে যে সামান্য পানি পাওয়া যাচ্ছে সেটিও দূষিত হওয়ার ঝুঁকিতে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছে, এই পরিস্থিতি দ্রুত একটি বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা UNICEF-এর মধ্য-২০২৬ সালের মূল্যায়ন অনুযায়ী, গাজার প্রায় ৮২ শতাংশ পরিবার পানির নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। ৭০ শতাংশ পর্যন্ত মানুষ দৈনিক পান করা ও রান্নার জন্য ন্যূনতম ৬ লিটার পানিও সংগ্রহ করতে পারছে না। একই সময়ে গাজার পানি ও স্যানিটেশন অবকাঠামোর প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
এখানেই সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি। একটি পানির ব্যবস্থা কেবল কল থেকে পানি সরবরাহ করে না; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে নলকূপ, বিদ্যুৎ, পাম্প, পাইপলাইন, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পানি শোধনাগার। এর যেকোনো একটি ভেঙে পড়লে পুরো ব্যবস্থাই অচল হয়ে যেতে পারে।
গাজায় এখন সেই পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছে।
আগে যে পরিবারগুলো পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি পেত, তাদের বড় অংশ এখন পানির ট্রাকের ওপর নির্ভরশীল। OCHA-এর আগস্টের হিসাবে, ১৩ লাখের বেশি মানুষ প্রতিদিন পানীয় ও রান্নার জন্য ৬ লিটারেরও কম পানি পাচ্ছিল। প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মানুষ পানির ট্রাক থেকে পানি সংগ্রহ করছিল।
কিন্তু পানি ট্রাক কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। যুদ্ধের কারণে রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত, জ্বালানি সীমিত এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি বেশি। ফলে পানি সরবরাহের একটি অংশ যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
সবচেয়ে বড় বিপদ তৈরি হচ্ছে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থায়। সেপ্টেম্বরের শুরুতে ফিলিস্তিনি পানি কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রতিদিন প্রায় ৫৫ হাজার ঘনমিটার বর্জ্যপানি গাজায় কোনো না কোনোভাবে অপরিশোধিত অবস্থায় পরিবেশে যাচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার ঘনমিটার সরাসরি সমুদ্রে এবং আরও প্রায় ১৫ হাজার ঘনমিটার সেসপিট ও ফুটো হওয়া নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মাটিতে ছড়িয়ে পড়ছে। পাঁচটি প্রধান বর্জ্যপানি শোধনাগারই অচল এবং যুদ্ধের আগে চালু থাকা প্রায় ৭৪টি পাম্পিং স্টেশনের মাত্র ১৮টি আংশিকভাবে কাজ করছে।
এর অর্থ, পানির সংকট আসলে একই সঙ্গে বর্জ্যপানি সংকট।
বিশেষজ্ঞদের ভয়, দূষিত পানি ও অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন থেকে ডায়রিয়া, ত্বকের রোগ, হেপাটাইটিস এসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের বিস্তার আরও বাড়তে পারে। UNICEF ইতোমধ্যেই জানিয়েছে, অপর্যাপ্ত নিরাপদ পানি, আবর্জনা জমে থাকা এবং অপর্যাপ্ত ল্যাট্রিনের কারণে রোগজীবাণু ও রোগবাহী প্রাণীর বিস্তারের ঝুঁকি বেড়েছে।
WHO-এর সাম্প্রতিক সতর্কবার্তা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করেছে। ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে প্রায় ৬,৭০০টি পানির নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, জানুয়ারির তুলনায় আগস্টে মাইক্রোবায়োলজিক্যাল দূষণের হার প্রায় তিন গুণ বেড়েছে—৬ শতাংশের নিচ থেকে ১৮ শতাংশের বেশি। একই সময়ে তীব্র ডায়রিয়ার ঘটনা মার্চের প্রায় ২৭ হাজার থেকে বেড়ে ৪৮ হাজারের বেশি হয়েছে বলে WHO জানিয়েছে।
গাজার সামনে এখন আরেকটি বড় আশঙ্কা—বর্ষা।
বৃষ্টির পানি যদি ভাঙা নর্দমা, আবর্জনা ও অপরিশোধিত বর্জ্যপানির সঙ্গে মিশে যায়, তাহলে আশ্রয়কেন্দ্র ও তাঁবুগুলোতে দূষিত পানি ঢুকে পড়তে পারে। এতে একই জায়গায় থাকা হাজার হাজার মানুষের মধ্যে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। WHO-এর ভাষায়, পর্যাপ্ত পানি ও পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে বর্ষার সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
সমস্যা শুধু পানির পরিমাণে নয়, পানির মানেও। সমুদ্রের পানি লবণাক্ত, ভূগর্ভস্থ পানির উৎস বর্জ্যপানিতে দূষিত হচ্ছে, আর পাইপলাইন নষ্ট হওয়ায় নিরাপদ পানি মানুষের ঘরে পৌঁছানোর স্বাভাবিক ব্যবস্থা ভেঙে গেছে। আন্তর্জাতিক রেডক্রসও জানিয়েছে, পানি বিতরণ পাইপের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়ায় মানুষ পানির ট্রাকের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে।
এদিকে আগস্টের শেষ সপ্তাহেও UNICEF-সমর্থিত পানি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। অর্থাৎ জরুরি সহায়তার মাধ্যমে যে সীমিত পানি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা হয়েছে, সেটিও নিরাপদ নয়।
সব মিলিয়ে গাজার পানি সংকট এখন শুধু মানবিক সহায়তার সমস্যা নয়—এটি একটি জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা। পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও স্বাস্থ্যসেবা—সবগুলো ব্যবস্থা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। একটি ব্যবস্থা পুনর্গঠন না করলে অন্যটির কার্যকারিতাও সীমিত থাকবে।
গাজায় তাই যুদ্ধের পর পুনর্গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হবে—মানুষের ঘরে আবার নিরাপদ পানি কীভাবে পৌঁছানো যাবে?
কারণ ধ্বংস হওয়া একটি ভবন পরে পুনর্নির্মাণ করা সম্ভব। কিন্তু দূষিত পানি থেকে ছড়িয়ে পড়া রোগের মূল্য দিতে হয় মানুষের শরীর ও জীবনের মাধ্যমে।
