১৯৪৫ সালের আগস্ট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন শেষ পর্যায়ে। জার্মানি আত্মসমর্পণ করেছে, কিন্তু জাপান এখনো যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। এমন সময় মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুদ্ধে ব্যবহার করা হলো পারমাণবিক অস্ত্র।
৬ আগস্ট সকালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বি-২৯ বোমারু বিমান হিরোশিমার আকাশে পৌঁছায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিস্ফোরিত হয় ‘লিটল বয়’। মাত্র একটি বোমায় শহরের বিশাল অংশ ধ্বংস হয়ে যায় এবং হাজার হাজার মানুষ নিহত হন। তিন দিন পর, ৯ আগস্ট, দ্বিতীয় বোমা ‘ফ্যাট ম্যান’ ফেলা হয় নাগাসাকিতে। ন্যাশনাল আর্কাইভসের তথ্য অনুযায়ী, দুই হামলায় কয়েক দশক হাজার মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে ও পরবর্তী সময়ে প্রাণ হারান।
আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে সেই দুই বিস্ফোরণের ৮১ বছর পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু এত বছর পরও একটি প্রশ্নের উত্তর নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে পূর্ণ ঐকমত্য নেই—জাপানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারমাণবিক বোমাই কি মূল কারণ ছিল?
কেন বোমা ফেলা হয়েছিল?
যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত ব্যাখ্যা হলো, জাপানের মূল ভূখণ্ডে সরাসরি স্থল অভিযান শুরু করলে বিপুলসংখ্যক মার্কিন ও জাপানি সেনা এবং বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হতে পারত। সেই সম্ভাব্য রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এড়াতে প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন।
হিরোশিমা ছিল সামরিক ও শিল্পগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহর। জাপানের সামরিক যোগাযোগ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় এর ভূমিকা ছিল। ফলে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি লক্ষ্য বেছে নিতে চেয়েছিল যেখানে বোমার সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব দুটোই দেখা যাবে।
কিন্তু এখানেই শুরু হয় বিতর্ক।
জাপান কি আগেই আত্মসমর্পণের পথে ছিল?
১৯৪৫ সালের গ্রীষ্মে জাপান অত্যন্ত কঠিন অবস্থায় ছিল। জার্মানির পতনের পর দেশটি কার্যত একা হয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিমান হামলায় জাপানের বহু শহর ধ্বংস হয়েছিল। একই সময়ে জাপানের নৌ ও বিমান শক্তিও ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে যায়।
এর মধ্যে ৮ আগস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং পরদিন মানচুরিয়ায় জাপানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। অর্থাৎ হিরোশিমার মাত্র তিন দিন পর এবং নাগাসাকির দিনেই জাপান আরও একটি বড় সামরিক ধাক্কা পায়।
এখানেই ইতিহাসবিদদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক রয়েছে। কিছু গবেষকের মতে, পারমাণবিক বোমার পাশাপাশি সোভিয়েত ইউনিয়নের যুদ্ধে প্রবেশও জাপানের আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ঐতিহাসিক সুনিও হাশেগাওয়ার বিশ্লেষণে এমনকি যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে সোভিয়েত আক্রমণ জাপানের নেতৃত্বের কাছে পারমাণবিক হামলার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
তাহলে দ্বিতীয় বোমা এত দ্রুত কেন?
হিরোশিমা ধ্বংস হওয়ার পর জাপান আত্মসমর্পণ করেনি। তিন দিন পর নাগাসাকিতে দ্বিতীয় পারমাণবিক বোমা ফেলা হয়।
কিন্তু এই সিদ্ধান্তও ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত বিষয়। সমালোচকদের প্রশ্ন—হিরোশিমার ধ্বংসযজ্ঞ ও সোভিয়েত আক্রমণের পর এত দ্রুত দ্বিতীয় শহরে বোমা ফেলার প্রয়োজন কতটা ছিল?
অন্যদিকে মার্কিন সিদ্ধান্তের পক্ষে থাকা ইতিহাসবিদেরা বলেন, জাপানের নেতৃত্ব তখনও আত্মসমর্পণের বিষয়ে বিভক্ত ছিল। দ্বিতীয় হামলা যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার জন্য প্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করেছিল।
পারমাণবিক হামলাই কি জাপানকে আত্মসমর্পণ করিয়েছিল?
এখানেও সরল উত্তর নেই।
একটি মত হলো—হিরোশিমা ও নাগাসাকির ভয়াবহ ধ্বংস জাপানের নেতৃত্বকে বুঝিয়ে দেয় যে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব। অন্য মত বলছে, শুধু বোমা নয়—সোভিয়েত ইউনিয়নের যুদ্ধে প্রবেশ, জাপানের সামরিক পরাজয় এবং দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ মিলেই আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত তৈরি করে।
সম্রাট হিরোহিতোর হস্তক্ষেপ শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটি এগিয়ে নেয়। ১৫ আগস্ট ১৯৪৫ জাপানের জনগণ প্রথমবারের মতো সম্রাটের কণ্ঠে আত্মসমর্পণের ঘোষণা শোনে।
শুধু দুই শহরের ইতিহাস নয়
হিরোশিমা ও নাগাসাকির গল্প কেবল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির ইতিহাস নয়। এটি পারমাণবিক যুগের সূচনাও।
বিস্ফোরণের পর যারা বেঁচে গিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন ক্যানসার, বিকিরণজনিত অসুস্থতা এবং সামাজিক বৈষম্যের সঙ্গে লড়াই করেছেন। তাদের বলা হয় হিবাকুশা। আজও তারা বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্র বিলোপের দাবির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ।
২০২৬ সালের নাগাসাকি স্মরণ অনুষ্ঠানে শহরটির মেয়র শিরো সুজুকি পারমাণবিক অস্ত্রকে মানবতার জন্য চরম বিপদ হিসেবে তুলে ধরে সতর্ক করেছেন। অনুষ্ঠানে ৯০টির বেশি দেশের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
৮১ বছর পরও তাই হিরোশিমা ও নাগাসাকি শুধু ইতিহাসের দুটি নাম নয়। এগুলো এমন দুটি প্রশ্নের প্রতীক, যার উত্তর নিয়ে বিশ্ব আজও বিতর্ক করে—যুদ্ধ দ্রুত শেষ করতে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার কি প্রয়োজনীয় ছিল, নাকি মানবতার জন্য একটি ভয়াবহ সীমা অতিক্রম করা হয়েছিল?
ইতিহাস হয়তো কখনো এক বাক্যে এই বিতর্কের চূড়ান্ত উত্তর দেবে না। কিন্তু হিরোশিমা ও নাগাসাকির ধ্বংসাবশেষ আজও একটি বিষয় স্পষ্ট করে—পারমাণবিক অস্ত্রের যুগে একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মূল্য কখনো কখনো কয়েকটি শহরের সীমা ছাড়িয়ে পুরো মানবজাতির ভবিষ্যৎ পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
