ইন্দোনেশিয়ায় বন ও ভূমি আগুনের ধোঁয়া এখন শুধু পরিবেশগত সংকট নয়, বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যায় রূপ নিয়েছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা আগুনের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘন ধোঁয়াশা ছড়িয়ে পড়েছে। আর সেই দূষিত বাতাসে তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ১ লাখ ৭০ হাজার। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নতুন পরিসংখ্যান সামনে আসার পর পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছেই
ইন্দোনেশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ১৮ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বন ও ভূমি আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত সাতটি প্রদেশে তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের ১ লাখ ৭৪ হাজার ৬৯৪টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে ৪০ হাজার ৩৬৩ জনই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিবেশস্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক থেন সুয়ান্তি জানিয়েছেন, আক্রান্তদের বড় অংশ ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছেন। তবে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪ হাজার ৫৩৩টি সক্রিয় রোগীর ঘটনা ছিল। আগুন ও ধোঁয়ার পরিস্থিতির কারণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় রিয়াউ, জাম্বি, দক্ষিণ সুমাত্রা, পশ্চিম কালিমান্তান, মধ্য কালিমান্তান, দক্ষিণ কালিমান্তান ও পূর্ব কালিমান্তান—এই সাতটি প্রদেশে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
আগের হিসাবের সঙ্গে তুলনা করলে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতিও বোঝা যায়। ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যেখানে ১ লাখ ১৩ হাজারের বেশি শ্বাসযন্ত্রের রোগীর কথা জানানো হয়েছিল, পরবর্তী প্রায় দুই সপ্তাহে সেই সংখ্যা আরও কয়েক দশ হাজার বেড়েছে।
বিপজ্জনক ধোঁয়ার বড় উৎস বন ও পিটভূমির আগুন
ইন্দোনেশিয়ায় শুষ্ক মৌসুমে বন ও ভূমি আগুন নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে এবার আগুনের বিস্তার এবং ধোঁয়ার তীব্রতা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। বিশেষ করে সুমাত্রা ও কালিমান্তানের বিস্তীর্ণ এলাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়ায় বাতাসে সূক্ষ্ম কণার মাত্রা বেড়েছে।
পিটভূমিতে আগুন লাগলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। ওপরের অংশের আগুন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও মাটির নিচে দীর্ঘ সময় ধরে আগুন জ্বলতে পারে। ফলে এক জায়গায় আগুন নিয়ন্ত্রণের পরও নতুন করে ধোঁয়া তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বায়ুদূষণের এই পরিস্থিতিতে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং আগে থেকেই শ্বাসযন্ত্রের সমস্যায় ভোগা মানুষের ঝুঁকি বেশি। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ তাই বায়ুর মান খারাপ হলে বাইরে বের হওয়া কমানো, প্রয়োজন হলে মাস্ক ব্যবহার এবং পর্যাপ্ত পানি পান করার পরামর্শ দিয়েছে।
শুধু ইন্দোনেশিয়াই নয়, প্রভাব পড়ছে প্রতিবেশী দেশেও
ইন্দোনেশিয়ার আগুনের ধোঁয়া দেশের সীমানার মধ্যেই আটকে নেই। বাতাসের গতিপথের ওপর নির্ভর করে ধোঁয়া মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ব্রুনেইসহ আশপাশের দেশগুলোর কিছু অংশেও পৌঁছেছে। ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আবারও আন্তসীমান্ত ধোঁয়াশা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে আগুনের উৎস নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষাও এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ আগুন যতদিন চলবে, ততদিন ধোঁয়ার কারণে নতুন রোগীর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
বৃষ্টি না আসা পর্যন্ত স্বস্তি অনিশ্চিত
ইন্দোনেশিয়ার অনেক এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক আবহাওয়া আগুন নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলছে। পিটভূমির আগুন, শুকনো উদ্ভিদ এবং বাতাসের কারণে আগুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকছে।
ফলে শুধু আগুন নেভানো নয়, আগুনের উৎস বন্ধ করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানো—দুই দিকেই সমান গুরুত্ব দিতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। ১ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি শ্বাসযন্ত্রের রোগীর হিসাব দেখিয়ে দিয়েছে, বন ও ভূমি আগুনের প্রভাব এখন পরিবেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে সরাসরি মানুষের ঘর ও শরীরে পৌঁছে গেছে।
এসইও-ফ্রেন্ডলি স্লাগ:indonesia-haze-respiratory-cases
