ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযানের কয়েক মাস পর সামনে এলো গুরুতর এক আন্তর্জাতিক অভিযোগ। জাতিসংঘ-সমর্থিত স্বাধীন তদন্তকারীরা বলছেন, ইরানের একটি স্কুল ও একটি ক্রীড়া স্থাপনায় মার্কিন হামলার ঘটনায় যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হওয়ার ‘যুক্তিসংগত ভিত্তি’ রয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগটি এসেছে মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ঘিরে, যেখানে হামলায় বিপুলসংখ্যক শিশু নিহত হয়।
জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের শাজারেহ তাইয়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইরানি কর্মকর্তাদের হিসাবে, হামলায় ১৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন, যাদের মধ্যে প্রায় ১২০ জন ছিল শিশু।
তদন্তকারীদের মতে, বিদ্যালয়টি একটি স্পষ্টভাবে শনাক্তযোগ্য বেসামরিক স্থাপনা ছিল। সেটি সামরিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল—এমন প্রমাণও তদন্তে পাওয়া যায়নি। এ কারণে সেখানে হামলার সিদ্ধান্ত নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে জাতিসংঘ-সমর্থিত মিশন।
পুরোনো গোয়েন্দা তথ্যেই কি হামলা?
তদন্ত প্রতিবেদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে ব্যবহৃত গোয়েন্দা তথ্য। তদন্তকারীদের মতে, মার্কিন বাহিনীর কাছে এমন তথ্য ছিল যে ওই এলাকায় একজন উচ্চপদস্থ ইরানি সামরিক কর্মকর্তা অবস্থান করছেন। কিন্তু হামলার আগে তথ্যটি যথেষ্টভাবে যাচাই বা হালনাগাদ করা হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যালয়টি সামরিক লক্ষ্যবস্তু কি না তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় যাচাই করা হয়নি। এমনকি ভবনটির বেসামরিক পরিচয়ও যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বলে তদন্তকারীরা মনে করছেন।
এই পরিস্থিতিতে তদন্ত মিশন বলেছে, ঘটনাটি কেবল সাধারণ অবহেলার পর্যায়ে পড়ে না। বরং বেসামরিক স্থাপনায় আঘাত হানার উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকা সত্ত্বেও হামলা চালানো হয়ে থাকতে পারে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে তারা।
এর ফলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও যুদ্ধ আইনের আওতায় ঘটনাটি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
লামেরদের ক্রীড়া কেন্দ্রেও প্রাণহানি
শুধু মিনাবের স্কুল নয়, ইরানের লামের্দ শহরের একটি ক্রীড়া কেন্দ্রেও আরেকটি মার্কিন হামলার ঘটনা তদন্ত করেছে মিশনটি।
তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় আশপাশের আবাসিক ভবন ও একটি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ২২ জন বেসামরিক মানুষ নিহত ও আহত হন। তদন্ত মিশন হামলাটিকেও নির্বিচার আক্রমণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
তবে এই ঘটনার দায় যুক্তরাষ্ট্র অস্বীকার করেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এর আগে জানিয়েছিল, ওই দিনে লামের্দ শহরে তারা কোনো হামলা চালায়নি।
ফলে এই হামলার দায় নির্ধারণ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্কের সুযোগ রয়েছে। তদন্তকারীদের সিদ্ধান্ত একদিকে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্তৃপক্ষের অস্বীকৃতি বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা অবস্থান
জাতিসংঘ-সমর্থিত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্র এর findings গ্রহণ করেনি। মার্কিন কর্মকর্তারা এর আগেও বলে আসছেন, তাদের সামরিক অভিযান আন্তর্জাতিক আইন ও যুদ্ধের আইন মেনেই পরিচালিত হয়েছে।
হোয়াইট হাউসও তদন্তের সমালোচনা করেছে। মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানি কর্তৃপক্ষই সংঘাতের সময়ে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী।
পেন্টাগন জানিয়েছে, মিনাবের স্কুলে হামলার বিষয়ে তাদের নিজস্ব তদন্ত এখনও চলমান এবং এ মুহূর্তে নতুন কোনো ফলাফল প্রকাশ করা হচ্ছে না।
অর্থাৎ, জাতিসংঘ-সমর্থিত মিশনের অভিযোগ সামনে এলেও যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে দায় স্বীকার করেনি।
ইরান সরকারের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ
প্রতিবেদনটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তদন্তকারীরা শুধু মার্কিন সামরিক অভিযান নিয়েই অভিযোগ তোলেননি। ইরানের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধেও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।
গত বছরের শেষ দিকে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের সময় ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, নির্বিচারে আটক, জোরপূর্বক গুম এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমনের অভিযোগ তদন্তে উঠে এসেছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষ অবশ্য এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে আসছে। সরকারের দাবি, বিক্ষোভের পেছনে বিদেশি শক্তির মদদপুষ্ট সন্ত্রাসী ও সরকারবিরোধী গোষ্ঠী সক্রিয় ছিল।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, বিক্ষোভে নিহত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা স্বাধীনভাবে পুরোপুরি যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে সরকারি পরিসংখ্যানের তুলনায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
আন্তর্জাতিক আইনে পরবর্তী পদক্ষেপ কী?
জাতিসংঘের এই মিশন সরাসরি কোনো ব্যক্তিকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারে না। তবে তাদের প্রতিবেদন ভবিষ্যতে জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্ভাব্য আইনি প্রক্রিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
বিশেষ করে বেসামরিক স্থাপনায় হামলা, লক্ষ্য নির্ধারণে গোয়েন্দা তথ্যের যথার্থতা এবং হামলার আগে সম্ভাব্য বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি যাচাই করা হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক তদন্তের কেন্দ্রে চলে এসেছে।
ফলে ইরান যুদ্ধের সামরিক পর্ব শেষ হলেও এর আইনি ও মানবাধিকার সংক্রান্ত বিতর্ক যে সহজে শেষ হচ্ছে না, জাতিসংঘ-সমর্থিত এই প্রতিবেদন তারই নতুন ইঙ্গিত।
