যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন তাঁর আলোচনার প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। কিন্তু সেই দাবির পর এবার রহস্য আরও ঘনীভূত করলেন কিম জং উনের প্রভাবশালী বোন ও শীর্ষ কর্মকর্তা কিম ইয়ো জং। তাঁর সোজাসাপ্টা বক্তব্য—ভাই কিম জং উন সত্যিই ট্রাম্পের সঙ্গে সম্প্রতি যোগাযোগ করেছেন কি না, সে বিষয়ে তিনি ‘সম্পূর্ণ অজ্ঞাত’।
গত ১৯ আগস্ট দেওয়া এক বিবৃতিতে কিম ইয়ো জং বলেন, ওয়াশিংটন থেকে উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের দুই নেতার মধ্যে যোগাযোগের যে খবর এসেছে, সে বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তাঁর ভাষায়, উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পররাষ্ট্রনীতি-সংক্রান্ত এমন কোনো বিষয় থাকলে এটিই সম্ভবত একমাত্র বিষয়, যার ব্যাপারে তিনি অবগত নন।
এই বক্তব্যের কারণেই আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—ট্রাম্পের দাবি কি সত্যিই কোনো গোপন যোগাযোগের ইঙ্গিত, নাকি তিনি সম্ভাব্য আলোচনার পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছেন?
ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘তিনি সাড়া দিয়েছেন’
ঘটনার শুরু ট্রাম্পের এক মন্তব্য থেকে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কিম জং উন তাঁর সঙ্গে কথা বলার প্রস্তাবে কেন সাড়া দেননি। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘তিনি সাড়া দিয়েছেন।’ তবে কীভাবে, কখন বা কোন মাধ্যমে সেই যোগাযোগ হয়েছে—সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
এরপর ট্রাম্প আরও বলেন, তিনি চলতি বছরের মধ্যেই কিম জং উনের সঙ্গে সাক্ষাতের পরিকল্পনা করছেন। একই সময়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে, ট্রাম্প তাঁর সহযোগীদের একটি সম্ভাব্য বৈঠকের ব্যবস্থা করার জন্য চাপ দিচ্ছেন এবং চলতি বছরের শরৎকালেই সেই বৈঠক হতে পারে।
কিন্তু কিম ইয়ো জংয়ের ‘আমি সম্পূর্ণ অজ্ঞাত’ মন্তব্য ট্রাম্পের সেই দাবির সঙ্গে স্পষ্টতই সাংঘর্ষিক বলে মনে হচ্ছে।
তবু ট্রাম্পকে নিয়ে ‘ভালো স্মৃতি’ রয়েছে
বিষয়টির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো—যোগাযোগের খবর নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলেও কিম ইয়ো জং ট্রাম্প ও তাঁর ভাইয়ের ব্যক্তিগত সম্পর্ক পুরোপুরি অস্বীকার করেননি। বরং তিনি ইঙ্গিত দেন, কিম জং উনের মনে ট্রাম্পকে নিয়ে ভালো স্মৃতি ও ইতিবাচক অনুভূতি রয়েছে এবং দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ‘চমৎকার’ ছিল।
এখানেই তৈরি হয়েছে কূটনৈতিক ধাঁধা। ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালো হলেও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দুই দেশের সম্পর্ক কি আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরতে প্রস্তুত?
ট্রাম্প ও কিম জং উন এর আগে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে একাধিক ঐতিহাসিক বৈঠক করেছিলেন। তবে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে মতবিরোধের কারণে শেষ পর্যন্ত সেই আলোচনা ভেঙে যায়।
সামরিক মহড়া কমানোও কি আলোচনার বার্তা?
এই নাটকীয় ঘটনার মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়া। ট্রাম্পের নির্দেশের পর মহড়াটি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হয় এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ট্রাম্প এর আগে এসব মহড়াকে উত্তর কোরিয়ার প্রতি ‘শত্রুতাপূর্ণ’ বার্তা হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
তবে কিম ইয়ো জং এই পদক্ষেপকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে রাজি নন। তাঁর মতে, মহড়ার সময় বা পরিসর কমালেও এর মূল চরিত্র বদলায় না; উত্তর কোরিয়ার দৃষ্টিতে এটি এখনো উসকানিমূলক ও আক্রমণাত্মক।
অর্থাৎ, ট্রাম্প হয়তো উত্তেজনা কমিয়ে আলোচনার পথ খুলতে চাইছেন, কিন্তু পিয়ংইয়ং এখনো ওয়াশিংটনের নীতিতে মৌলিক পরিবর্তনের কোনো প্রমাণ দেখছে না।
সব মিলিয়ে কিম ইয়ো জংয়ের মাত্র কয়েকটি বাক্য নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। সত্যিই কি কিম জং উন ও ট্রাম্পের মধ্যে গোপন যোগাযোগ হয়েছে? নাকি এটি সম্ভাব্য নতুন শীর্ষ বৈঠকের আগে কূটনৈতিক চাপ ও রাজনৈতিক বার্তার খেলা?
একদিকে ট্রাম্প বলছেন, যোগাযোগ হয়েছে এবং বৈঠকও হবে। অন্যদিকে কিম জং উনের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক সহযোগী বলছেন, তিনি এ বিষয়ে ‘সম্পূর্ণ অজ্ঞাত’। তবে ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রশংসা রেখে দেওয়ায় একটি বিষয় স্পষ্ট—ওয়াশিংটন ও পিয়ংইয়ংয়ের দরজা এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
