একসময় লাতিন আমেরিকায় বামপন্থী সরকারের ঢেউকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রধান প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছর পর সেই দৃশ্যপট অনেকটাই বদলে গেছে। কলম্বিয়া, পেরু, আর্জেন্টিনা, চিলি ও অন্যান্য দেশে ডানপন্থী বা রক্ষণশীল শক্তির উত্থান এখন আঞ্চলিক রাজনীতির নতুন বাস্তবতা। সামনে ব্রাজিলের নির্বাচন—আর সেখানে লুলা দা সিলভার বিপরীতে ফ্লাভিও বলসোনারোর লড়াই এই পরিবর্তনের গতি আরও স্পষ্ট করতে পারে।
২০২৬ সালে কলম্বিয়ায় ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী নেতা আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। পেরুতেও রক্ষণশীল কেইকো ফুজিমোরি ক্ষমতায় ফেরার পথ তৈরি করেছেন। এর আগে আর্জেন্টিনা, চিলি, ইকুয়েডর, বলিভিয়া ও পানামায় ডানমুখী রাজনীতির উত্থান আঞ্চলিক রাজনৈতিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন এনেছে।
কেন ভোটাররা ডানদিকে ঝুঁকছেন
এই পরিবর্তনের পেছনে একটি মাত্র কারণ নেই। অর্থনৈতিক দুর্বলতা, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, অপরাধ, মাদক চোরাচালান এবং সরকারের প্রতি হতাশা—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে কাজ করছে।
অনেক ভোটারের কাছে আদর্শগত বাম-ডান বিভাজনের চেয়ে দৈনন্দিন নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধ বেড়ে গেলে কঠোর নিরাপত্তা নীতির প্রতিশ্রুতি দেওয়া প্রার্থীরা দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেন।
কলম্বিয়ার সাম্প্রতিক নির্বাচন তার একটি বড় উদাহরণ। দে লা এসপ্রিয়েলা নিরাপত্তা ও অপরাধ দমনের কঠোর অবস্থান সামনে এনেছেন। মাদক পাচার ও অবৈধ খননের বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতিও তার প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
কলম্বিয়া বদলেছে, কিন্তু বামপন্থা শেষ হয়নি
কলম্বিয়ায় ডানপন্থীদের বিজয় গুরুত্বপূর্ণ হলেও দেশটির বাম রাজনীতি অদৃশ্য হয়ে যায়নি। নতুন প্রেসিডেন্টকে বিভক্ত কংগ্রেসের সঙ্গে কাজ করতে হবে, যেখানে বামপন্থী শক্তিরও উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে।
ফলে নির্বাচনে জয়লাভ করাই যথেষ্ট নয়; নতুন সরকারকে বাস্তব নীতি বাস্তবায়নের জন্য বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে।
এটি পুরো অঞ্চলের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে ভোটাররা একবার ডান দিকে গেলেই স্থায়ীভাবে ডানপন্থী হয়ে যাচ্ছেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনই ঠিক হবে না। বরং ভোটাররা অনেক ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে বিকল্প বেছে নিচ্ছেন।
ব্রাজিল হতে পারে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখন ব্রাজিল। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গণতন্ত্র এবং এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি হিসেবে ব্রাজিলের নির্বাচন শুধু দেশের ভবিষ্যৎ নয়, পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক প্রবণতাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
সর্বশেষ ডেটাফোলহা জরিপে সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফায় লুলা ৪৬ শতাংশ এবং ফ্লাভিও ৪৪ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন। ব্যবধান মাত্র দুই শতাংশীয় পয়েন্ট। প্রথম দফায়ও লুলা ৩৯ শতাংশ নিয়ে এগিয়ে, তবে ফ্লাভিও ৩৫ শতাংশে কাছাকাছি রয়েছেন।
ফলে ব্রাজিলের ভোটে ডানপন্থী শিবিরের উত্থান পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। আবার লুলা জয়ী হলে সেটি হবে ডানমুখী প্রবাহের মাঝেও বামপন্থী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ পাল্টা উদাহরণ।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ
লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক অবস্থানও জড়িয়ে আছে। ওয়াশিংটন এখন মাদক পাচার, অভিবাসন, নিরাপত্তা এবং চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব—সবগুলো বিষয়কে আঞ্চলিক নীতির অংশ হিসেবে দেখছে।
কলম্বিয়ার নতুন ডানপন্থী সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ তারই উদাহরণ। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সাম্প্রতিক কলম্বিয়া সফরে মাদকবিরোধী অভিযান, নিরাপত্তা সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
ফলে লাতিন আমেরিকার ডানমুখী রাজনৈতিক পরিবর্তন শুধু অভ্যন্তরীণ ভোটের ফল নয়; এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিযোগিতাও যুক্ত হচ্ছে।
এই উত্থান কতটা স্থায়ী হবে
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই। ডানপন্থী দলগুলো যদি নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে বাস্তব উন্নতি করতে পারে, তাহলে তাদের জনপ্রিয়তা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। কিন্তু কঠোর নিরাপত্তা নীতি যদি মানবাধিকার বিতর্ক তৈরি করে কিংবা অর্থনীতি প্রত্যাশা অনুযায়ী উন্নত না হয়, তাহলে ভোটাররা আবারও বাম বা মধ্যপন্থী শক্তির দিকে ফিরতে পারেন।
লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার এই দোলাচল নতুন নয়। এক সময় বামপন্থী ঢেউ এসেছিল, এখন ডানপন্থী ঢেউ দেখা যাচ্ছে। ভবিষ্যতে আবারও রাজনৈতিক পালাবদল হতে পারে।
তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে স্থায়ী ডানপন্থী বিপ্লবের চেয়ে একটি বড় রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত। কলম্বিয়ার পরিবর্তন, পেরুর রক্ষণশীল উত্থান এবং ব্রাজিলের ঘনিষ্ঠ নির্বাচনী লড়াই দেখাচ্ছে—লাতিন আমেরিকার ভোটাররা এখন পুরোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কার্যকর শাসনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
আগামী কয়েকটি নির্বাচন তাই শুধু কে সরকার গঠন করবে তা নির্ধারণ করবে না। এগুলো ঠিক করবে লাতিন আমেরিকা আগামী দশকে ডান, বাম নাকি মাঝামাঝি কোনো নতুন রাজনৈতিক পথ বেছে নেবে।
