সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের শাসনামলের এক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাকে প্রথমবারের মতো সিরীয় কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দিয়েছে লেবানন। মেজর জেনারেল আদেল ইসাকে হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা উসকে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগে সিরিয়ায় প্রত্যর্পণ করা হয়েছে। আসাদ সরকারের পতনের পর লেবানন থেকে কোনো সাবেক সামরিক কর্মকর্তাকে সিরিয়ার হাতে তুলে দেওয়ার এটিই প্রথম ঘটনা।
৬৭ বছর বয়সী আদেল ইসা সিরিয়ার সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি একসময় সিরীয় সেনাবাহিনীর ১৭তম ডিভিশনের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় দেইর এজ-জোরে স্থলবাহিনীর নেতৃত্বও দেন। ২০১৬ সালে তিনি অবসর নেন। আসাদ সরকারের পতনের পর তিনি লেবাননে চলে যান।
ইসাকে চলতি মাসের শুরুতে বৈরুতে আটক করা হয়। জানা গেছে, ৭ আগস্ট তিনি প্রশাসনিক কাগজপত্র সংক্রান্ত কাজের জন্য বৈরুতে অবস্থিত সিরীয় দূতাবাসে গিয়েছিলেন। সেখানে তার পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর দূতাবাসের পক্ষ থেকে লেবাননের কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়। এরপর তাকে আটক করা হয়।
সিরিয়ার নতুন কর্তৃপক্ষ ইসার বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ এনেছে। এর মধ্যে রয়েছে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, একাধিক ব্যক্তিকে হত্যার অভিযোগ, নির্যাতনের ফলে মৃত্যু এবং গৃহযুদ্ধ ও সাম্প্রদায়িক সংঘাত উসকে দেওয়ার চেষ্টা। সিরিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই তাকে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছিল।
লেবাননের বিচার বিভাগ ১৯৫১ সালে স্বাক্ষরিত লেবানন-সিরিয়া বিচারিক সহযোগিতা চুক্তির আওতায় তাকে সিরিয়ার কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর ১৯ আগস্ট তাকে দুই দেশের সীমান্ত দিয়ে সিরীয় কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া হয়। সিরিয়ায় পৌঁছানোর পর তার মামলাটি দামেস্কের একজন তদন্তকারী বিচারকের কাছে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী ধাপে তাকে ফৌজদারি আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ইসা অবশ্য তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। লেবাননে আটকের সময় তিনি দাবি করেছিলেন, সামরিক বাহিনীতে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুসরণ করতেন। তবে সিরীয় কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের ভিত্তিতে বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দীর্ঘদিনের আসাদ শাসনের পতনের পর সিরিয়ায় সাবেক সরকারের কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিদ্রোহীদের ১১ দিনের অভিযানের পর বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হয়ে রাশিয়ায় পালিয়ে যান। এরপর নতুন সরকার সাবেক শাসনামলের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও যুদ্ধকালীন অপরাধের জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়।
সাম্প্রতিক সময়ে এই বিচারপ্রক্রিয়া আরও দৃশ্যমান হয়েছে। সিরিয়ার একটি আদালত বাশার আল-আসাদ ও তার ভাই মাহের আল-আসাদসহ কয়েকজন সাবেক শাসকগোষ্ঠীর সদস্যকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। আসাদের এক চাচাতো ভাই ওয়াসিম আল-আসাদকেও সম্প্রতি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আদেল ইসাকে লেবানন থেকে সিরিয়ায় ফেরত পাঠানোর ঘটনাটি তাই শুধু একটি প্রত্যর্পণ নয়; এটি দুই দেশের সম্পর্কেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আসাদ আমলে সিরিয়ার লেবাননের ওপর ব্যাপক রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব ছিল। ১৯৭৬ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত সিরীয় বাহিনী লেবাননে অবস্থান করেছিল। একই সময়ে হিজবুল্লাহও আসাদ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা নেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসার প্রত্যর্পণ ভবিষ্যতে লেবাননে আশ্রয় নেওয়া আরও বহু সাবেক আসাদপন্থী কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা সদস্যের ক্ষেত্রে নজির তৈরি করতে পারে। একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, আসাদ সরকারের পতনের পর প্রায় ১০০ থেকে ২০০ জন সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা লেবাননে প্রবেশ করেছেন বলে ধারণা করা হয়। ফলে আদেল ইসার ঘটনা সামনে আরও প্রত্যর্পণ ও বিচারপ্রক্রিয়ার পথ খুলে দিতে পারে।
দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর সিরিয়া এখন অতীতের অপরাধের বিচার এবং নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কঠিন পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। লেবাননের হাতে আটক সাবেক এই জেনারেলকে সিরিয়ায় ফিরিয়ে দেওয়া সেই বিচারপ্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা শেষ পর্যন্ত আদালতের বিচারেই নির্ধারিত হবে।
