ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ যখন প্রায় সাত মাসে গড়িয়েছে, ঠিক তখনই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে পৌঁছেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। যুদ্ধ থামানোর কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা এখনো হয়নি, কিন্তু একই সময়ে দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের মধ্যে যোগাযোগের খবর সামনে আসায় নিউইয়র্কের কূটনৈতিক মঞ্চকে সম্ভাব্য আলোচনার নতুন ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নিউইয়র্কে পেজেশকিয়ান
ইরানের প্রেসিডেন্ট মঙ্গলবার নিউইয়র্কে পৌঁছেছেন। বুধবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে তার বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে।
তার সঙ্গে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং অন্যান্য কর্মকর্তা। যুক্তরাষ্ট্র এর আগে পেজেশকিয়ান ও প্রয়োজনীয় ইরানি কর্মকর্তাদের নিউইয়র্কে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছিল, যদিও ইরানি প্রতিনিধিদলকে সীমিত রাখা হয়েছে।
ইরানি প্রেসিডেন্টের সফরের প্রধান উদ্দেশ্যগুলোর একটি হলো যুদ্ধ নিয়ে তেহরানের অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলের সামনে তুলে ধরা।
আলোচনার সম্ভাবনা, কিন্তু অবিশ্বাসও তীব্র
পেজেশকিয়ান নিউইয়র্কে যাওয়ার আগে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপের মাধ্যমে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে চাইছে। তার বক্তব্যে আগের আলোচনার সময় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক সংঘর্ষের প্রসঙ্গও উঠে এসেছে।
ফলে তেহরানের পক্ষ থেকে আলোচনার বিষয়ে আগ্রহ থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর গভীর অবিশ্বাস রয়েছে।
তবুও কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনা একেবারে বন্ধ হয়নি।
মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের বৈঠক
নিউইয়র্কে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে কয়েক ঘণ্টার বৈঠকের কথা জানিয়েছেন ট্রাম্প। এটি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দুই পক্ষের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সরাসরি যোগাযোগগুলোর একটি হিসেবে সামনে এসেছে।
ট্রাম্প বৈঠককে ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে পেজেশকিয়ান ও ট্রাম্পের মধ্যে সরাসরি বৈঠক এখনো নির্ধারিত হয়নি।
আরব দেশগুলো দুই পক্ষের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক আয়োজনের জন্য মধ্যস্থতা করছে বলেও খবর রয়েছে।
হরমুজ খুলতে ইরানের শর্ত
ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমালে এবং ইরানি বন্দরগুলোর অবরোধ প্রত্যাহার করলে হরমুজ প্রণালি সাত দিনের মধ্যে পুনরায় খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
হরমুজ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। যুদ্ধের কারণে এই পথের চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
অর্থাৎ সম্ভাব্য শান্তি আলোচনায় শুধু যুদ্ধ বন্ধ নয়, আন্তর্জাতিক নৌপথও গুরুত্বপূর্ণ দর-কষাকষির বিষয় হয়ে উঠেছে।
জাতিসংঘ কি সমঝোতার মঞ্চ হবে?
ইরানের প্রতিনিধিদল মনে করছে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ দুই পক্ষের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রও একেবারে আলোচনার দরজা বন্ধ করেনি।
কিন্তু একই সময়ে ট্রাম্প জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে ইরানকে ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছেন।
এই বৈপরীত্যই বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। একদিকে সামরিক চাপ ও নতুন নিষেধাজ্ঞা, অন্যদিকে নিউইয়র্কে গোপন বা পরোক্ষ আলোচনা।
পেজেশকিয়ানের জাতিসংঘ ভাষণ এবং তার পরবর্তী কূটনৈতিক বৈঠকগুলো তাই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের পরবর্তী গতিপথ বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ থামানোর মতো সমঝোতা হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত; তবে নিউইয়র্কে অন্তত আলোচনার একটি নতুন জানালা খুলেছে।
