দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে চলে আসা রাশিয়া–জাপানের দীর্ঘদিনের ভূখণ্ড বিরোধে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন প্রথমবারের মতো জাপানের দাবিকৃত কুরিল দ্বীপপুঞ্জের একটি দ্বীপে সফর করেছেন। তাঁর এই সফরের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে টোকিও। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এই সফরকে ‘একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে মন্তব্য করেছেন।
১৩ আগস্ট পুতিন রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা ইতুরুপ দ্বীপে যান। জাপানে দ্বীপটি ‘এতোরোফু’ নামে পরিচিত। এটি কুরিল দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণাঞ্চলের চারটি বিতর্কিত দ্বীপের একটি, যেগুলোকে জাপান ‘নর্দার্ন টেরিটরিজ’ বলে দাবি করে। বর্তমানে দ্বীপগুলো রাশিয়ার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
পুতিনের সফর ছিল প্রতীকী ও রাজনৈতিক—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। রুশ রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ইতুরুপে স্থানীয় গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং একটি মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, হাসপাতাল ও স্কুল পরিদর্শন করেন। মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে তাঁকে ক্যাভিয়ারও পরিবেশন করা হয়।
তবে এই সফরের তাৎপর্য শুধু স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পুতিনের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এই প্রথম তিনি বিতর্কিত কুরিল দ্বীপপুঞ্জে সরাসরি পা রাখলেন। ফলে জাপানের সঙ্গে রাশিয়ার পুরোনো ভূখণ্ড বিরোধ আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বীপগুলো?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে ১৯৪৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন কুরিল দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণাঞ্চল দখল করে নেয়। এরপর সেখানকার জাপানি জনগোষ্ঠীকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং দ্বীপগুলো সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরও রাশিয়া ওই অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। জাপান অবশ্য এখনো চারটি দ্বীপ—ইতুরুপ, কুনাশির, শিকোতান ও হাবোমাই দ্বীপমালা—নিজেদের ‘অবিচ্ছেদ্য ভূখণ্ড’ হিসেবে দাবি করে।
এই বিরোধের কারণে রাশিয়া ও জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির পরও পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করতে পারেনি। অর্থাৎ কয়েক দশক পরও দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে যুদ্ধ-পরবর্তী একটি অসম্পূর্ণ অধ্যায় রয়ে গেছে।
পুতিনের সফরে ক্ষুব্ধ জাপান
পুতিনের সফরের পরপরই জাপান রাশিয়ার বিরুদ্ধে কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানায়। জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোশিমিতসু মোতেগি রুশ রাষ্ট্রদূতকে তলব করেন। প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি বলেন, বিতর্কিত দ্বীপে রুশ প্রেসিডেন্টের সফর জাপান কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না। টোকিও আবারও জানায়, নর্দার্ন টেরিটরিজ ঐতিহাসিক ও আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে জাপানের ভূখণ্ড।
রাশিয়া অবশ্য জাপানের প্রতিবাদ প্রত্যাখ্যান করেছে। রুশ কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে বলেছেন, দক্ষিণ কুরিল দ্বীপপুঞ্জ রাশিয়ার ভূখণ্ড এবং এ বিষয়ে মস্কোর অবস্থানে কোনো পরিবর্তন নেই। রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভও বলেছেন, দ্বীপগুলো ‘ছিল, আছে এবং থাকবে’ রাশিয়ার ভূখণ্ড।
সময়টাও কি কাকতালীয়?
পুতিনের সফরের সময় নিয়েও বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তিনি এমন এক সময়ে বিতর্কিত দ্বীপে গেলেন, যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির বার্ষিকী ঘনিয়ে এসেছে। এর পাশাপাশি সফরের আগে রাশিয়া সাখালিনের আশপাশে নৌমহড়াও চালাচ্ছিল। ফলে জাপানের কাছে এই সফর শুধু ভূখণ্ডের ওপর রাশিয়ার দাবি পুনর্ব্যক্ত করা নয়, বরং সামরিক ও কৌশলগত বার্তাও বহন করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
রাশিয়া–জাপান সম্পর্ক ইউক্রেন যুদ্ধের পর আরও খারাপ হয়েছে। মস্কোর ইউক্রেন অভিযানকে কেন্দ্র করে জাপান পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় যোগ দেওয়ার পর দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের দূরত্ব বেড়েছে। এর মধ্যে কুরিল দ্বীপপুঞ্জে পুতিনের সরাসরি সফর পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
কুরিল দ্বীপপুঞ্জ কৌশলগতভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর প্রশান্ত মহাসাগর ও ওখোৎস্ক সাগরের মধ্যে এর অবস্থান রাশিয়ার সামরিক ও নৌ কৌশলে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। একই সঙ্গে দ্বীপগুলোর আশপাশের সমুদ্র মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক সম্পদে সমৃদ্ধ।
ফলে পুতিনের এই সফরকে নিছক একটি আঞ্চলিক সফর হিসেবে দেখছে না টোকিও। জাপানের চোখে এটি তাদের দীর্ঘদিনের ভূখণ্ড দাবির প্রতি মস্কোর সরাসরি চ্যালেঞ্জ। আর রাশিয়ার কাছে এটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ডে প্রেসিডেন্টের উপস্থিতির মাধ্যমে সার্বভৌমত্বের বার্তা।
দুই দেশের সম্পর্ক যখন এমনিতেই টানাপোড়েনের মধ্যে, তখন পুতিনের বিতর্কিত দ্বীপ সফর পুরোনো ক্ষতকে আবারও উসকে দিল। শান্তিচুক্তির পথে যে অমীমাংসিত ভূখণ্ড বিরোধ কয়েক দশক ধরে বাধা হয়ে আছে, এই সফর সেই সমস্যার দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা আরও কঠিন করে তুলল বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
