মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে চাইছে দক্ষিণ কোরিয়া। এ লক্ষ্যেই কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, তাজিকিস্তান ও কিরগিজস্তানের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট পর্যায়ের শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করেছে সিউল।
দক্ষিণ কোরিয়ার এই উদ্যোগ শুধু কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; এর পেছনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, জ্বালানি, প্রযুক্তি, পরিবহন এবং সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থ। অন্যদিকে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোও রাশিয়া ও চীনের বাইরে নিজেদের আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব বাড়াতে চাইছে।
এক মঞ্চে মধ্য এশিয়ার পাঁচ দেশ
সিউলে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে মধ্য এশিয়ার পাঁচ দেশের নেতারা অংশ নিচ্ছেন। ২০০৭ সাল থেকে দক্ষিণ কোরিয়া ও মধ্য এশিয়ার মধ্যে নিয়মিত সংলাপ চললেও এবার প্রথমবারের মতো সেটি রাষ্ট্রপ্রধান পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে।
এই পরিবর্তনকে দুই পক্ষই সম্পর্কের নতুন পর্যায় হিসেবে দেখছে। কারণ আলোচনার বিষয় শুধু রাজনৈতিক সম্পর্ক নয়; বরং বাস্তব অর্থনৈতিক প্রকল্প নিয়েও সমঝোতার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং পৃথকভাবে মধ্য এশিয়ার নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এসব আলোচনায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি ও প্রযুক্তি সহযোগিতার বিষয় উঠে এসেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রয়োজন কী
দক্ষিণ কোরিয়া প্রযুক্তি ও শিল্প উৎপাদনে বিশ্বে শক্তিশালী হলেও গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের ক্ষেত্রে দেশটির নিজস্ব সম্পদ সীমিত। বিশেষ করে ব্যাটারি, ইলেকট্রনিকস, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও উন্নত শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ নিয়ে সিউলকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হচ্ছে।
মধ্য এশিয়ায় রয়েছে ইউরেনিয়াম, তেল, গ্যাস এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বড় মজুত। ফলে অঞ্চলটি দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্প ও প্রযুক্তি অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে।
তবে দক্ষিণ কোরিয়ার লক্ষ্য শুধু কাঁচামাল কেনা নয়। দেশটি প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও শিল্প উৎপাদনে নিজেদের দক্ষতা ব্যবহার করে স্থানীয় পর্যায়ে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উৎপাদন বাড়াতে আগ্রহী।
মধ্য এশিয়ার দেশগুলোরও লাভ আছে
মধ্য এশিয়ার পাঁচ দেশ দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়া ও চীনের ওপর বিভিন্ন ক্ষেত্রে নির্ভরশীল। ইউক্রেন যুদ্ধের পর এই দেশগুলোর সামনে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব আরও বৈচিত্র্যময় করার প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়াকে তুলনামূলকভাবে কম রাজনৈতিক শর্তযুক্ত অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে কোরীয় বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও শিল্প জ্ঞান মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর জন্য আকর্ষণীয় হতে পারে।
বিশেষ করে কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তান নিজেদের কাঁচামালনির্ভর অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির দিকে যেতে চাইছে।
কে-সিল্ক রোডের বিস্তার
দক্ষিণ কোরিয়া ২০২৪ সালে ‘কে-সিল্ক রোড’ নামে মধ্য এশিয়াকেন্দ্রিক একটি কৌশল ঘোষণা করেছিল। এর উদ্দেশ্য শুধু খনিজ সংগ্রহ নয়; পরিবহন, ডিজিটাল প্রযুক্তি, শিল্প উৎপাদন ও মানবসম্পদ উন্নয়নেও সহযোগিতা বাড়ানো।
এই কৌশলের মাধ্যমে সিউল মধ্য এশিয়াকে একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে দেখতে চাইছে।
২০২৫ সালের শেষ নাগাদ মধ্য এশিয়ায় দক্ষিণ কোরিয়ার সরাসরি বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংস্কৃতিও বড় হাতিয়ার
অর্থনীতির পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার সাংস্কৃতিক প্রভাবও মধ্য এশিয়ায় দ্রুত বেড়েছে। কোরীয় নাটক, কে-পপ, খাবার এবং ভাষা শেখার আগ্রহের কারণে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার পরিচিতি বাড়ছে।
সোভিয়েত আমলে মধ্য এশিয়ায় বসতি স্থাপন করা কোরীয় বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীও দুই অঞ্চলের ঐতিহাসিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ফলে সিউলের বর্তমান উদ্যোগকে শুধু বাণিজ্যিক কৌশল হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও কূটনীতিকে একসঙ্গে ব্যবহার করে দক্ষিণ কোরিয়া মধ্য এশিয়ায় নিজেদের উপস্থিতি বাড়াতে চাইছে।
সামনে বড় প্রশ্ন হবে—বহু সমঝোতা স্মারকের বাইরে গিয়ে কতগুলো প্রকল্প বাস্তবে বিনিয়োগ ও উৎপাদনে রূপ নেয়। সেটিই নির্ধারণ করবে সিউলের নতুন মধ্য এশিয়া নীতি কতটা কার্যকর হয়।
