দক্ষিণ কোরিয়া হরমুজ প্রণালিতে চলমান সামরিক সংঘাতে সরাসরি জড়াবে না এবং যুদ্ধের অংশ হিসেবে সেখানে সেনা বা সামরিক সরঞ্জাম পাঠাবে না—স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মিত্র দেশগুলোর সামরিক সহায়তার আহ্বানের মধ্যেই সিউল নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করল।
শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে লি বলেন, দক্ষিণ কোরিয়া এমন কোনো সামরিক মোতায়েন করবে না, যার ফলে দেশটি ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে তিনি জানান, দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিক, বাণিজ্যিক জাহাজ ও জ্বালানি পরিবহন রক্ষায় প্রয়োজনীয় সীমিত পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে।
যুদ্ধে জড়াবে না সিউল
হরমুজ প্রণালিতে সামরিক ভূমিকা নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে দক্ষিণ কোরিয়াকে ঘিরে নানা জল্পনা চলছিল। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের নিরাপত্তায় মিত্র দেশগুলোর সহযোগিতার আহ্বানের পর সিউলের সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা বাড়ে।
এর মধ্যেই প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং শুক্রবার কার্যত সেই জল্পনার অবসান ঘটান। তিনি বলেন, সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার মতো কোনো সেনা মোতায়েন করা হবে না। যুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ার প্রশ্নেও দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থান অপরিবর্তিত থাকবে বলে জানান তিনি।
তবে এর অর্থ এই নয় যে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি থেকে দক্ষিণ কোরিয়া পুরোপুরি দূরে থাকবে। দেশটির বিপুল বাণিজ্যিক স্বার্থ, জ্বালানি আমদানি এবং নাগরিকদের নিরাপত্তার কারণে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে সিউল।
জাহাজ ও তেল পরিবহনের নিরাপত্তায় নজর
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি বহনকারী বিপুলসংখ্যক জাহাজ এই জলপথ ব্যবহার করে। ফলে সেখানে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে দক্ষিণ কোরিয়ার মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতির ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে।
প্রেসিডেন্ট লি জানিয়েছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার লক্ষ্য হবে নিজেদের বাণিজ্যিক জাহাজ, অপরিশোধিত তেল পরিবহনের পথ এবং দেশটির নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ জন্য এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য এলাকায় থাকা দক্ষিণ কোরিয়ার নৌবাহিনীর চেওংহে ইউনিটের কার্যক্রম বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
অর্থাৎ সিউলের পরিকল্পিত পদক্ষেপের কেন্দ্রবিন্দু যুদ্ধ পরিচালনা নয়, বরং নাগরিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ সুরক্ষা।
আগেও পরিস্থিতি যাচাই করতে দল পাঠিয়েছিল সিউল
হরমুজে সেনা পাঠানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার পর দক্ষিণ কোরিয়া সরাসরি কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। বরং পরিস্থিতি বোঝার জন্য চলতি মাসের শুরুতে সংযুক্ত আরব আমিরাতে একটি তদন্তকারী দল পাঠানো হয়েছিল।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তখন জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও সেখানে কার্যক্রম পরিচালনার বাস্তব অবস্থা যাচাই করাই ওই দলের উদ্দেশ্য। মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছিল, দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত কোনো সামরিক মোতায়েনের পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে নেওয়া হয়নি।
এর আগে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালিতে সেনা পাঠানোর বিষয়ে তখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
ইরানের সতর্কবার্তাও ছিল আলোচনায়
সিউলের জন্য বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে ইরানের সতর্কবার্তার কারণে। এর আগে ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, হরমুজ প্রণালিতে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক উপস্থিতিকে তেহরান যুদ্ধের অংশগ্রহণ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সম্ভাব্য সামরিক ভূমিকা নিয়ে এমন সতর্কতা প্রকাশের পর দেশটির অভ্যন্তরেও বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। বিভিন্ন নাগরিক ও ধর্মীয় সংগঠন হরমুজে সামরিক মোতায়েনের বিরোধিতা করে।
এদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার পার্লামেন্টেও বিষয়টি নিয়ে মতবিরোধ দেখা যায়। ১৭ সেপ্টেম্বর দেশটির জাতীয় পরিষদের পররাষ্ট্র ও একীকরণবিষয়ক কমিটির বৈঠকে কয়েকজন ক্ষমতাসীন দলের সদস্য সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর বিরোধিতা করেন। সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য তখনও বলা হয়েছিল, সুনির্দিষ্ট কোনো সামরিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানের মধ্যেই সিউলের সিদ্ধান্ত
দক্ষিণ কোরিয়ার এই অবস্থান এমন সময়ে এল, যখন যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তায় মিত্র দেশগুলোর সহযোগিতা চাচ্ছে। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কয়েকটি দেশকে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ নিরাপদ রাখতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন।
তবে সিউল এখন যে সীমারেখা টানছে, তাতে বাণিজ্যিক জাহাজ ও নিজেদের নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের সুযোগ রাখা হলেও ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা কোনো সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার পথ বন্ধ রাখা হচ্ছে।
বিশ্লেষণাত্মকভাবে দেখলে, দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য এখানে দুটি স্বার্থ একসঙ্গে কাজ করছে—একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা জোটের সম্পর্ক, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যিক নৌপথের নিরাপত্তা। প্রেসিডেন্ট লির ঘোষণায় আপাতত সামরিক সংঘাতে সরাসরি অংশ না নেওয়ার নীতিই স্পষ্ট হয়েছে।
হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি আরও জটিল হলে দক্ষিণ কোরিয়া কী ধরনের সীমিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়, এখন সেটিই নজরে থাকবে। তবে প্রেসিডেন্ট লির শুক্রবারের ঘোষণায় অন্তত একটি বিষয় পরিষ্কার—হরমুজের সংঘাতে দক্ষিণ কোরিয়ার সেনা সরাসরি যুদ্ধে নামছে না।
