শক্তিশালী টাইফুন ডলফিনের প্রভাবে চীনের বিস্তীর্ণ এলাকায় ভয়াবহ বৃষ্টি ও বন্যা দেখা দিয়েছে। ঝড়টি স্থলভাগে প্রবেশের পর দুর্বল হয়ে গেলেও এর সঙ্গে থাকা বিপুল জলীয়বাষ্প দেশের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে প্রবল বৃষ্টি নামিয়েছে। বেইজিংসহ বিভিন্ন শহরে জলাবদ্ধতা, বন্যা ও যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়েছে।
ডলফিনকে ২০২৬ সালে চীনে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী টাইফুন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগর থেকে দীর্ঘ প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ঝড়টি চীনের দিকে এগিয়ে আসে। স্থলভাগে আঘাত হানার পর বাতাসের শক্তি কমে গেলেও এর বিশাল বৃষ্টিবাহী মেঘমালা দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে চীনের ভেতরে প্রবেশ করে।
ঝড়ের প্রভাবে ঝেজিয়াং, হুবেই, হেনানসহ বিভিন্ন প্রদেশে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। কয়েকটি এলাকায় এক দিনে ২০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হয়েছে। ১৩টি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে চলতি সপ্তাহে একদিনের বৃষ্টিপাতের নতুন রেকর্ডও তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বেইজিংকে ঘিরে। টাইফুনের অবশিষ্টাংশ রাজধানীর দিকে পৌঁছানোর পর সেখানে ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি করা হয়। কয়েকটি জেলায় সর্বোচ্চ মাত্রার বন্যা সতর্কতা জারি করা হয়। বেইজিংয়ের কিছু এলাকায় মাত্র এক ঘণ্টায় প্রায় ৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
প্রবল বৃষ্টির কারণে রাজধানীতে ২৫০টির বেশি বাস রুট বন্ধ রাখা হয়। প্রায় ১৫০টি পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ করা হয় এবং কয়েকটি মেট্রো লাইনে ট্রেনের গতি কমিয়ে দেওয়া হয়। অনেক সড়ক পানিতে ডুবে যাওয়ায় যানবাহন আটকে পড়ে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, হাসপাতাল ও অন্যান্য স্থাপনা রক্ষায় জরুরি ব্যবস্থা নেয় কর্তৃপক্ষ।
হুবেই প্রদেশেও পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে ওঠে। বন্যার ঝুঁকিতে থাকা কয়েকটি এলাকায় প্রায় ১০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়। ৩৫টি জলাধারে পানির স্তর নিরাপদ সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ঝুঁকিপূর্ণ নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার পাশাপাশি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোও সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
টাইফুনের সরাসরি প্রভাবের পাশাপাশি এর পরবর্তী বৃষ্টিই এখন বড় উদ্বেগের কারণ। ১৪ আগস্ট ঝেজিয়াং প্রদেশের চাংশিং কাউন্টিতে ভারী বৃষ্টির কারণে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। একটি বাড়ি ধসে একজন নিহত হন এবং আরও তিনজন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে। উদ্ধার অভিযান চলছে।
চীনের আবহাওয়া পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে মৌসুমি বায়ু ও অন্যান্য আবহাওয়াগত ব্যবস্থা। ফলে টাইফুন ডলফিন দুর্বল হয়ে গেলেও এর অবশিষ্টাংশ থেকে আরও বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে।
বিজ্ঞানীদের কাছেও ডলফিন বিশেষ আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এল নিনো পরিস্থিতি এবং উষ্ণ সমুদ্রের কারণে ঝড়টির দীর্ঘ যাত্রা ও শক্তি ধরে রাখার সক্ষমতা বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উষ্ণ বাতাস বেশি জলীয়বাষ্প ধারণ করতে পারায় ভবিষ্যতে এ ধরনের ঝড়ের বৃষ্টিপাত আরও তীব্র হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
চীনের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি সামলানো। ঝড় দুর্বল হলেও বিপদ পুরোপুরি কাটেনি। নদী, জলাধার ও পাহাড়ি এলাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে দুর্গত মানুষদের সরিয়ে নেওয়া এবং যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখার চেষ্টা চলছে।
টাইফুন ডলফিন তাই শুধু একটি ঘূর্ণিঝড়ের ঘটনা নয়; এটি চীনে ক্রমবর্ধমান চরম আবহাওয়ার ঝুঁকিরও নতুন উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
