সেপ্টেম্বরের শেষভাগে জাপানে আঘাত হানা শক্তিশালী টাইফুন দুজুয়ান সরে গেলেও রেখে গেছে বন্যা, ভূমিধস ও ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন। ঝড়ের তাণ্ডবে প্রথম দিকে অন্তত চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও পরে মৃতের সংখ্যা আরও বেড়েছে। ২৩ সেপ্টেম্বরের সর্বশেষ স্থানীয় হিসাব অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা নয়জনে পৌঁছেছে এবং আরও চারজন নিখোঁজ রয়েছেন।
ঝড়ের সঙ্গে প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে রাজধানী টোকিওসহ কানতো অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা ও ভূমিধস দেখা দেয়। অনেক জায়গায় রাস্তা ডুবে যায়, ঘরবাড়িতে কাদা ও পানি ঢুকে পড়ে এবং নদীর পানি বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যায়। বিদ্যুৎ সরবরাহেও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। ঝড়ের সবচেয়ে তীব্র পর্যায়ে প্রায় ৪৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার বাড়ি বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়।
বৃষ্টির পানিতে ডুবে যায় বিস্তীর্ণ এলাকা
দুজুয়ানের প্রভাবে জাপানের পূর্বাঞ্চলে যে বৃষ্টিপাত হয়েছে, তার তীব্রতা ছিল অস্বাভাবিক। স্থানীয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইজু দ্বীপপুঞ্জের ওশিমা এলাকায় ৪৮ ঘণ্টায় ৮৩২ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। সেপ্টেম্বরে একটি স্বাভাবিক মাসে যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়, এই পরিমাণ তার দ্বিগুণেরও বেশি। টোকিওর এদোগাওয়া এলাকাতেও ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে।
চিবা প্রিফেকচারের সাকুরা শহরে একটি নদীর পানি উপচে পড়ে কয়েক শ বাড়িঘর প্লাবিত হয়েছে। বেশ কিছু গাড়িও পানির নিচে চলে যায়। অন্যদিকে কানাগাওয়া এলাকায় ভূমিধসে ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উদ্ধারকারীরা কাদা ও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজ ব্যক্তিদের খোঁজ চালিয়েছেন।
নিরাপদ স্থানে সরানোর নির্দেশ
ঝড়ের আগেই জাপানের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ ও সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। একপর্যায়ে ১০ লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। কোথাও কোথাও এই সংখ্যা আরও বেশি ছিল বলে বিভিন্ন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ঝড়ের কারণে শত শত উড়োজাহাজের ফ্লাইট বাতিল বা পরিবর্তন করতে হয় এবং রেল ও সড়ক যোগাযোগেও বিঘ্ন ঘটে।
দুজুয়ান ধীরে ধীরে উত্তর-পূর্ব দিকে সরে যাওয়ার পর ঝড়ের তীব্রতা কমে আসে। তবে আবহাওয়া বিভাগ ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ভূমিধস এবং আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতা বজায় রাখে। কারণ মাটিতে বিপুল পরিমাণ পানি জমে থাকায় ঝড় চলে যাওয়ার পরও নতুন করে ভূমিধসের আশঙ্কা থাকে।
উদ্ধারকাজে বড় চ্যালেঞ্জ
ঝড়ের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিখোঁজদের সন্ধান, বিদ্যুৎ পুনঃস্থাপন এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার যোগাযোগ স্বাভাবিক করা। অনেক এলাকায় কাদা ও ধ্বংসাবশেষ সরাতে উদ্ধারকারী দলকে কাজ করতে হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও পানির অবকাঠামো পরীক্ষা করা হচ্ছে।
জাপান নিয়মিত টাইফুন ও ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ মোকাবিলা করলেও দুজুয়ানের সঙ্গে আসা অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত নতুন করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে রাজধানী টোকিওর আশপাশের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অল্প সময়ে বিপুল বৃষ্টিপাত হলে এর প্রভাব কতটা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে, এবারের ঘটনাতেও তা স্পষ্ট হয়েছে।
জাপানে মন্ত্রিসভায় বড় রদবদল, গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে ধারাবাহিকতাই রাখলেন প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি মন্ত্রিসভায় রদবদল করেছেন। তবে প্রত্যাশার তুলনায় পরিবর্তনের মাত্রা সীমিত রেখেছেন তিনি। গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের বড় অংশকে দায়িত্বে রেখে নতুন কয়েকজনকে যুক্ত করা হয়েছে। ১৭ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় তাকাইচি মন্ত্রিসভার এই পুনর্গঠন আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়।
নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের আগে মন্ত্রীরা পদত্যাগপত্র জমা দেন। এরপর নতুন মন্ত্রীদের নাম ঘোষণা এবং রাজপ্রাসাদে আনুষ্ঠানিক নিয়োগ সম্পন্ন হয়। তাকাইচি পরে সংবাদ সম্মেলনে নতুন মন্ত্রিসভার অগ্রাধিকার তুলে ধরেন।
অর্থনৈতিক নীতিতে বড় পরিবর্তন নয়
রদবদলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রীয় ব্যক্তিদের ধরে রাখা। অর্থমন্ত্রী সাতসুকি কাটায়ামা এবং অর্থনৈতিক নীতিবিষয়ক মন্ত্রী মিনোরু কিইউচিকে দায়িত্বে রাখা হয়েছে। অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী রিয়োসেই আকাজাওয়াকেও রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকার ব্যয় বৃদ্ধি, করনীতি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে যে নীতি অনুসরণ করছে, তাতে ধারাবাহিকতার বার্তা দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে আকাজাওয়ার দায়িত্ব বহাল রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও শুল্ক নিয়ে আলোচনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিনিয়োগ ও শুল্কসংক্রান্ত সমঝোতার পরবর্তী বাস্তবায়নেও তার ভূমিকা থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিরক্ষাতেও ধারাবাহিকতা
প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমিকেও পদে রাখা হয়েছে। জাপানের নিরাপত্তা পরিবেশ নিয়ে সরকারের উদ্বেগ এবং প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনার মধ্যে তার দায়িত্ব বহাল থাকা তাৎপর্যপূর্ণ। তাকাইচি সরকার আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি হিসেবে তুলে ধরেছে।
অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োশিমাসা হায়াশি মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েছেন। ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তার দীর্ঘদিনের প্রভাব রয়েছে। ফলে এই পরিবর্তনকে শুধু প্রশাসনিক রদবদল হিসেবে না দেখে দলীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটেও দেখা হচ্ছে।
অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতির চাপ
মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের সময় জাপান মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ইয়েন এবং সরকারি ব্যয় নিয়ে একাধিক চাপের মুখে রয়েছে। তাকাইচি সরকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সরকারি ব্যয় এবং করছাড়ের ওপর জোর দিচ্ছে। একই সময়ে সরকারি বন্ডের বাজারেও চাপ রয়েছে।
তাই নতুন মন্ত্রিসভায় অর্থনৈতিক দলের বড় অংশকে ধরে রাখার সিদ্ধান্তকে নীতির ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার নীতি এবং সরকারের আর্থিক ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্যও সামনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ
মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের আরেকটি প্রেক্ষাপট হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক। ওয়াশিংটন জাপানের কাছ থেকে প্রতিরক্ষা ব্যয়, যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ এবং বাণিজ্যিক ভারসাম্য নিয়ে বিভিন্ন দাবি জানিয়ে আসছে। ফলে তাকাইচির নতুন মন্ত্রিসভায় অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের ধরে রাখার সিদ্ধান্তকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নীতিগত ধারাবাহিকতার বার্তাও হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মাত্র তিন ঘণ্টায় দুই ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল উত্তর কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে নতুন বার্তা
কোরীয় উপদ্বীপে আবারও ক্ষেপণাস্ত্রের শব্দ। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে উত্তর কোরিয়া। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০ সেপ্টেম্বর পূর্ব উপকূলের ওয়ানসান এলাকা থেকে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ছোড়া হয় এবং পূর্ব সাগরের দিকে গিয়ে পড়ে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, দুটি উৎক্ষেপণের মধ্যে ব্যবধান ছিল কয়েক ঘণ্টা। প্রথমটির পর একই দিনে দ্বিতীয় একটি বস্তু নিক্ষেপ করা হয়। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া উভয়েই উৎক্ষেপণগুলো পর্যবেক্ষণ করে।
উত্তেজনার মধ্যেই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা
উত্তর কোরিয়ার এই পরীক্ষা এমন এক সময়ে হয়েছে যখন ওয়াশিংটন, সিউল ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে উত্তর কোরিয়া একাধিক অস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে। ফলে নতুন দুটি উৎক্ষেপণকে ধারাবাহিক অস্ত্র প্রদর্শনের অংশ হিসেবেই দেখছে দক্ষিণ কোরিয়া।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী উৎক্ষেপণের পর নজরদারি বাড়িয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সঙ্গে তথ্য বিনিময় করেছে। ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর ধরন, পাল্লা ও নির্দিষ্ট গতিপথ নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে বিভিন্ন মূল্যায়ন করা হলেও এগুলো স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বলে দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই সময়টি
উৎক্ষেপণের সময়টিও বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রেসিডেন্টের সম্ভাব্য উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের আগে উত্তর কোরিয়া এই পরীক্ষা চালায়। ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে পিয়ংইয়ং নিজের সামরিক সক্ষমতা ও উপস্থিতি আবারও সামনে আনতে চাইছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এর আগে উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক সহযোগিতারও সমালোচনা করেছে। পিয়ংইয়ং দীর্ঘদিন ধরে যৌথ সামরিক মহড়াগুলোকে নিজেদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখে আসছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন ও সিউল এসব মহড়াকে প্রতিরক্ষামূলক বলে বর্ণনা করে।
জাপান-দক্ষিণ কোরিয়ার নজরদারি বাড়ছে
উত্তর কোরিয়ার প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাই জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক নজরদারিকে বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে জাপানের সমুদ্রসীমার কাছাকাছি কোনো উৎক্ষেপণ হলে টোকিও তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভাব্য গতিপথ ও ঝুঁকি মূল্যায়ন করে।
এবারও দুই দেশ নিজেদের গোয়েন্দা ও নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে উৎক্ষেপণের তথ্য সংগ্রহ করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় বজায় রাখা হচ্ছে।
পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে নজর
দুটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের পর এখন নজর রয়েছে উত্তর কোরিয়ার পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। কারণ একই সময়ে পিয়ংইয়ং নতুন অস্ত্রব্যবস্থা পরীক্ষার কথাও জানিয়েছে। ফলে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা, নাকি বড় ধরনের অস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচির অংশ—তা নিয়ে আঞ্চলিক পর্যায়ে নজরদারি আরও বাড়ছে।
