মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও ইরানের ওপর সামরিক চাপ অব্যাহত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। হরমুজ প্রণালির প্রবেশপথের কাছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেশম দ্বীপে নতুন করে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই শুক্রবারের এই হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের একটি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে সীমিত পরিসরে এই অভিযান চালানো হয়েছে। ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটল, যখন কাতারের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরুর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
৬ নভেম্বর শুক্রবার ট্রাম্প জানান, মার্কিন বাহিনী ইরানের কেশম দ্বীপের কাছে একটি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় হামলা চালিয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল সীমিত ও লক্ষ্যভিত্তিক সামরিক অভিযান। তবে হামলায় কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে কিংবা ঠিক কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি ওয়াশিংটন।
কেশম দ্বীপটি ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত এবং হরমুজ প্রণালির উত্তর প্রবেশপথের কাছে এর অবস্থান। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথের পাশে হওয়ায় দ্বীপটির সামরিক ও কৌশলগত গুরুত্ব অনেক।
কেন কেশম দ্বীপ এত গুরুত্বপূর্ণ?
কেশম পারস্য উপসাগরের সবচেয়ে বড় দ্বীপ। ইরানের মূল ভূখণ্ডের কাছাকাছি অবস্থিত এই দ্বীপ থেকে হরমুজ প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।
বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের উল্লেখযোগ্য অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করে। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্বালানি রপ্তানির বড় অংশ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল।
ফলে কেশম দ্বীপের সামরিক স্থাপনা এবং আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বীপটির আশপাশে সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখে তেহরান উপসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে বেছে নেওয়ার বিষয়টি তাই তাৎপর্যপূর্ণ। এ ধরনের ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় হলে কোনো অঞ্চলে বিমান চলাচল ও সামরিক অভিযান পরিচালনার সুযোগ বাড়তে পারে।
নির্বাচনের আগেও হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র
কেশম দ্বীপে শুক্রবারের হামলা ছিল সাম্প্রতিক কয়েক দিনের মধ্যে মার্কিন বাহিনীর আরেকটি সামরিক অভিযান। এর আগে ২ নভেম্বরও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ভূখণ্ডে হামলা চালিয়েছিল। ওই অভিযানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক ও সামরিক অবস্থান লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন।
সাম্প্রতিক এসব হামলাকে ওয়াশিংটন প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, ইরানের সামরিক সক্ষমতা থেকে মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তার জন্য যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা কমানোই এসব অভিযানের উদ্দেশ্য।
তবে তেহরানের দৃষ্টিতে, এ ধরনের হামলা যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনাকে দুর্বল করছে এবং নতুন সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা, একই সময়ে সামরিক অভিযান
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হামলার সময়ই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। কাতার দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতা করছে। ইরান এরই মধ্যে সাত দফা শর্তসংবলিত একটি প্রস্তাব ওয়াশিংটনের কাছে পাঠিয়েছে।
তেহরানের দাবির মধ্যে রয়েছে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আটকে থাকা সম্পদ মুক্ত করা এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দেওয়া। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, যেকোনো সমঝোতায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
আলোচনায় একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতার বিষয়ও উঠে এসেছে। এর আওতায় মার্কিন অবরোধ শিথিল করা, ইরানের কিছু অর্থ ছাড় এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের প্রবেশের সুযোগ তৈরির সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে এসব প্রস্তাব এখনো চূড়ান্ত সমঝোতায় রূপ নেয়নি।
ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা
তেহরান বারবার সতর্ক করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নতুন করে হামলা চালালে তার জবাব আরও বিস্তৃত হবে। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি স্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ইরানের সামরিক কৌশলে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অনেক। দেশটি অতীতে একাধিকবার জানিয়েছে, নিজেদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে এই জলপথে চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এখানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য উভয়ই প্রভাবিত হতে পারে।
ট্রাম্পের সামনে দ্বিমুখী চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধরনের বিপর্যয়ের পর ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর ইরান যুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক চাপ বেড়েছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সামরিক ব্যয় এবং দীর্ঘ সংঘাতের প্রভাব নিয়ে মার্কিন ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
এ অবস্থায় ট্রাম্প একদিকে যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক পথ খোলা রাখছেন, অন্যদিকে ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার অভিযানও চালাচ্ছেন।
তবে এই দ্বিমুখী কৌশল কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সামরিক হামলা বাড়লে আলোচনার পরিবেশ নষ্ট হতে পারে। আবার ইরানের সঙ্গে সমঝোতা ছাড়া সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপও বাড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাতের ঝুঁকি
কেশম দ্বীপে হামলার পর পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ। ইরান যদি পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের অঞ্চলে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
অন্যদিকে কাতারের মধ্যস্থতায় আলোচনা এগোলে সামরিক উত্তেজনা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, কেশম দ্বীপে মার্কিন হামলা শুধু একটি সামরিক স্থাপনায় আঘাতের ঘটনা নয়। এটি এমন এক সংঘাতের নতুন অধ্যায়, যেখানে কূটনীতি ও সামরিক শক্তি একই সময়ে ব্যবহৃত হচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে ওয়াশিংটন ও তেহরান আলোচনার পথে এগোবে, নাকি আবারও সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে, তার ওপর নির্ভর করছে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি।
