চীনের পণ্য যাতে মার্কিন শুল্ক এড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ঢুকতে না পারে, সেই লড়াই এবার নতুন মাত্রা পেল। চীনা পণ্য তৃতীয় দেশের মাধ্যমে ঘুরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে শুল্ক ফাঁকিতে সহায়তার অভিযোগে ৪০টিরও বেশি দেশের দিকে আঙুল তুলেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক পথ, কম শুল্ক এবং উৎপাদনব্যবস্থার সুযোগ কাজে লাগিয়ে চীনা রপ্তানিকারকেরা মার্কিন শুল্ক এড়িয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউস বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ২৫ পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদনে এই ব্যবস্থাকে ‘দ্য গ্রেট ট্রান্সশিপমেন্ট স্ক্যাম’ বা ‘বড় ধরনের পণ্য পুনঃপ্রেরণ কেলেঙ্কারি’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ শুল্কের দেশ থেকে পণ্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর বদলে অপেক্ষাকৃত কম শুল্কের তৃতীয় দেশে পাঠানো হচ্ছে। এরপর সামান্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং, লেবেল পরিবর্তন কিংবা কাগজপত্রে পরিবর্তনের মাধ্যমে পণ্যের উৎস অন্য দেশ হিসেবে দেখিয়ে তা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হচ্ছে।
যেসব দেশ নিয়ে উদ্বেগ যুক্তরাষ্ট্রের
এই তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও বড় বাণিজ্যিক অংশীদারও রয়েছে। কানাডা, মেক্সিকো, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ ৪০টির বেশি দেশকে অবৈধ ‘ট্রান্সশিপমেন্ট’ ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তবে তালিকায় থাকা প্রতিটি দেশই যে ইচ্ছাকৃতভাবে চীনকে শুল্ক ফাঁকিতে সহায়তা করছে—এমন সরাসরি অভিযোগ প্রতিবেদনের অর্থ নয়। কিছু দেশের ক্ষেত্রে বৈধ বাণিজ্যের মধ্যেই ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রান্সশিপমেন্ট নিজে কোনো অবৈধ কাজ নয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে একটি পণ্য উৎপাদনকারী দেশ থেকে অন্য দেশে গিয়ে পরে তৃতীয় দেশে পৌঁছানো স্বাভাবিক বিষয়। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন ইচ্ছাকৃতভাবে পণ্যের প্রকৃত উৎপত্তি গোপন করে শুল্ক এড়ানোর চেষ্টা করা হয়।
বছরে হারাচ্ছে কোটি কোটি ডলারের রাজস্ব
হোয়াইট হাউসের হিসাব অনুযায়ী, এই ধরনের শুল্ক ফাঁকির কারণে যুক্তরাষ্ট্র বছরে ১৯ থেকে ২৬ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত শুল্ক রাজস্ব হারাতে পারে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বছরে সর্বোচ্চ ৩০৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য এ ধরনের অবৈধ ট্রান্সশিপমেন্টের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে—যদিও এটি সম্ভাব্য সর্বোচ্চ হিসাব; প্রতিবেদনের কেন্দ্রীয় অনুমান এর চেয়ে অনেক কম।
ওয়াশিংটনের অভিযোগের মূল লক্ষ্য শুধু রাজস্ব আদায় নয়। যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, চীনা কোম্পানিগুলো এভাবে মার্কিন শুল্ক কাঠামোর উদ্দেশ্যকেই দুর্বল করে দিচ্ছে। সরাসরি চীনা পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করেও যদি একই পণ্য অন্য দেশের পরিচয়ে মার্কিন বাজারে ঢুকে পড়ে, তাহলে সেই শুল্কনীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
এবার নজরদারিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ট্রাম্প প্রশাসন সীমান্ত ও বাণিজ্য নজরদারিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে। প্রস্তাবিত ‘Detective Border’ ব্যবস্থা পণ্যের চালান, রুট, উৎপাদনক্ষমতা, মালিকানার সম্পর্ক, পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক তথ্য বিশ্লেষণ করে সন্দেহজনক চালান শনাক্ত করতে সাহায্য করবে।
এর ফলে কোনো পণ্য কাগজে-কলমে অন্য দেশের হলেও বাস্তবে সেটি কোথায় তৈরি হয়েছে, কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করছে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে কোন দেশগুলো জড়িত—তা আরও কঠোরভাবে যাচাই করা হতে পারে।
বাড়তে পারে বাণিজ্যিক উত্তেজনা
যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযোগ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। কারণ তালিকায় থাকা অনেক দেশই ওয়াশিংটনের মিত্র বা গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। বিশেষ করে ভারত, জাপান, কানাডা, মেক্সিকো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো অর্থনীতির নাম আসায় বিষয়টি শুধু যুক্তরাষ্ট্র-চীন বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না।
অন্যদিকে, সমালোচকেরা বলছেন, কোনো দেশের সরবরাহ শৃঙ্খলে চীনা উপাদান থাকলেই সেই পণ্য চীনা পণ্য হয়ে যায় না। বিশেষ করে বহুজাতিক উৎপাদন ব্যবস্থায় একটি পণ্যের কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ, সংযোজন ও চূড়ান্ত উৎপাদন বিভিন্ন দেশে হতে পারে। ফলে কোন পর্যায়ে একটি পণ্যের ‘উৎপত্তি’ বদলে যায়, সেটি নির্ধারণ করা জটিল।
তবে ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্ট করে দিয়েছে—চীনা পণ্যকে তৃতীয় দেশের মাধ্যমে ঘুরিয়ে মার্কিন শুল্ক এড়ানোর সুযোগ আর সহজে দেওয়া হবে না। ফলে সামনে যুক্তরাষ্ট্রের কাস্টমস নজরদারি যেমন কঠোর হতে পারে, তেমনি বিশ্বব্যাপী চীনা পণ্যের সরবরাহপথেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
সব মিলিয়ে, চীনকে লক্ষ্য করে শুরু হওয়া মার্কিন শুল্কযুদ্ধ এখন তৃতীয় দেশগুলোর বাণিজ্যপথেও পৌঁছে গেছে। ওয়াশিংটনের নতুন অবস্থান বাস্তবায়িত হলে বিশ্ব বাণিজ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল, উৎপাদনকেন্দ্র এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর এর বড় প্রভাব পড়তে পারে।
