যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর একটি নতুন বিমানবাহী রণতরীর নাম ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পার্ল হারবারে অসাধারণ সাহসিকতার জন্য খ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ নৌসেনা ডরিস ‘ডোরি’ মিলারের নামে নামকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে যুদ্ধজাহাজটির, সেটির নাম এখন বদলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামে করার বিষয়টি অভ্যন্তরীণভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে তিনটি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, নির্মাণাধীন ফোর্ড-ক্লাস বিমানবাহী রণতরীটির নাম পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নিয়ে নৌবাহিনীর মধ্যে আলোচনা চলছে। ২০২০ সালে প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের সময় ঘোষণা করা হয়েছিল, জাহাজটির নাম হবে USS Doris Miller। এই নামকরণ ছিল ঐতিহাসিক, কারণ এটি একজন কৃষ্ণাঙ্গ ও তালিকাভুক্ত নৌসেনার নামে প্রথম বিমানবাহী রণতরী হওয়ার কথা ছিল।
পার্ল হারবারে যে সাহসিকতার নজির
ডরিস মিলার ছিলেন মার্কিন নৌবাহিনীর একজন মেস অ্যাটেনডেন্ট—তৎকালীন সময়ে কৃষ্ণাঙ্গ নৌসেনাদের জন্য যে ধরনের দায়িত্ব নির্ধারিত ছিল, তারই একটি পদে তিনি কাজ করতেন।
১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর জাপান পার্ল হারবারে হামলা চালালে মিলার নিজের জাহাজে আহতদের উদ্ধারে এগিয়ে আসেন। প্রশিক্ষণ না থাকা সত্ত্বেও তিনি একটি মেশিনগান পরিচালনা করে জাপানি বিমানের বিরুদ্ধে গুলি চালান এবং গুরুতর আহত জাহাজের ক্যাপ্টেনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে সহায়তা করেন।
তার সাহসিকতার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৪২ সালে তাকে Navy Cross দেওয়া হয়। তৎকালীন নৌবাহিনীর সর্বোচ্চ সামরিক সম্মানগুলোর একটি ছিল এটি। মিলার পরে যুদ্ধকালীন বন্ড বিক্রির প্রচারণায় অংশ নেন এবং কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন সেনাসদস্যদের প্রতিনিধিত্বকারী গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে ওঠেন।
তবে তার সামরিক জীবন দীর্ঘ হয়নি। ১৯৪৩ সালে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধের সময় জাপানি সাবমেরিনের টর্পেডো হামলায় তার জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হলে মিলার নিহত হন।
এবার সেই নামই কি বদলে যাবে?
সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন রণতরীটির নাম কী হতে পারে, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো নেই। তবে দুটি সূত্র জানিয়েছে, অভ্যন্তরীণ আলোচনায় ট্রাম্পের নামে জাহাজটির নামকরণের বিষয়টি উঠে এসেছে।
এমনটি হলে তা হবে অত্যন্ত নজিরবিহীন ঘটনা। মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরীগুলোর নাম সাধারণত সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট, গুরুত্বপূর্ণ নৌবাহিনী কর্মকর্তা কিংবা বড় ঐতিহাসিক সামরিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নামে রাখা হয়। একজন বর্তমান প্রেসিডেন্টের নামে বিমানবাহী রণতরী নামকরণ করা হলে সেটি সেই প্রচলিত ধারার ব্যতিক্রম হবে।
এরই মধ্যে জাহাজটির নামকরণ নিয়ে নৌবাহিনীর নীতিও পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। ২০২৫ সালে জাহাজ ও সামরিক স্থাপনার নাম পর্যালোচনার জন্য একটি কমিশন গঠন করা হয়েছিল। সাবেক নৌবাহিনী সচিব জন ফেলানের মত ছিল, বিমানবাহী রণতরীর নাম মূলত প্রেসিডেন্ট, নৌবাহিনীর অ্যাডমিরাল অথবা গুরুত্বপূর্ণ নৌযুদ্ধের নামে হওয়া উচিত।
মিলারকে পুরোপুরি ভুলে যাচ্ছে না নৌবাহিনী
তবে ডরিস মিলারের নাম মুছে ফেলার সম্ভাবনা থাকলেও তাকে সম্মান জানানোর অন্য পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানা গেছে।
একটি সূত্রের দাবি, নৌবাহিনী অন্য একটি যুদ্ধজাহাজের নাম মিলারের নামে রাখার কথা ভাবছে। একই সঙ্গে তাকে মরণোত্তর Medal of Honor, যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সামরিক বীরত্বপদক, দেওয়ার জন্যও সুপারিশ করা হচ্ছে। এই পদক অনুমোদনের ক্ষেত্রে কংগ্রেস ও প্রেসিডেন্টের ভূমিকা রয়েছে।
মিলারের পরিবারের সদস্যরাও বিষয়টি নিয়ে বিস্মিত হয়েছেন। তার পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নাম পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে নৌবাহিনী তাদের আগে অবহিত করেনি। তবে দীর্ঘদিন ধরে মিলারকে Medal of Honor দেওয়ার প্রচেষ্টার কারণে সেই সুপারিশকে ইতিবাচক হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হচ্ছে
সম্ভাব্য নাম পরিবর্তনের খবর প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। সমালোচকদের অনেকেই বলছেন, একজন যুদ্ধবীর কৃষ্ণাঙ্গ নৌসেনার নামে নির্ধারিত জাহাজের নাম পরিবর্তন করে একজন জীবিত রাজনৈতিক নেতার নামে করার উদ্যোগ সামরিক ঐতিহ্য ও প্রতীকী স্বীকৃতির প্রশ্ন তুলছে।
সাবেক নৌ কর্মকর্তা ও ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক কেলিসহ সমালোচকেরা মিলারের বীরত্বের কথা তুলে ধরে সম্ভাব্য নাম পরিবর্তনের বিরোধিতা করেছেন। নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন নাম ও প্রতীক পুনর্বিবেচনার বৃহত্তর প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেও বিষয়টিকে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত আগের কিছু নাম ও সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের চেষ্টা নিয়ে ইতোমধ্যে বিতর্ক রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—USS Doris Miller-এর নাম পরিবর্তনের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো ঘোষণা করা হয়নি। ফলে শেষ পর্যন্ত রণতরীটির নাম ট্রাম্পের নামে হবে, অন্য কোনো নামে হবে, নাকি মিলারের নামই বহাল থাকবে—তা এখনো অনিশ্চিত।
তবে সম্ভাব্য এই পরিবর্তন ইতোমধ্যেই একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে: মার্কিন সামরিক ইতিহাসে বীরত্বের স্বীকৃতি কি রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যাবে, নাকি ডরিস মিলারের মতো যুদ্ধবীরদের অবদানই দীর্ঘমেয়াদে অমর থাকবে?
