মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর প্রধান জন র্যাটক্লিফের আকস্মিক মস্কো সফর ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র জল্পনা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ন্যাটোকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার টানাপোড়েনের মধ্যেই অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে রাশিয়ার রাজধানীতে যান তিনি। সফরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আগে থেকে দেওয়া হয়নি।
২৫ আগস্ট মস্কোয় যান র্যাটক্লিফ। মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি রুশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তাঁর সফরের খবর প্রকাশ্যে আসে মস্কোর একটি বিমানবন্দরে মার্কিন সামরিক পরিবহন বিমান এবং পরে মার্কিন কূটনৈতিক বহর দেখা যাওয়ার পর।
রুশ প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ পরে নিশ্চিত করেন, সিআইএ প্রধান রুশ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তবে তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করেননি। পেসকভ জানান, বৈঠকের ফলাফল সম্পর্কে পুতিনকে অবহিত করা হয়েছে।
কেন এত গোপনীয়তা?
সফরের সবচেয়ে বড় রহস্য হলো—ঠিক কী উদ্দেশ্যে র্যাটক্লিফ মস্কো গিয়েছিলেন? ওয়াশিংটন আনুষ্ঠানিকভাবে বৈঠকের বিস্তারিত প্রকাশ করেনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সফরটিকে ‘সেমি-রুটিন’ বা আংশিক নিয়মিত যোগাযোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে সফরের সময় ও গোপনীয়তা আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে।
কারণ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগ কার্যত অচলাবস্থায় রয়েছে। একই সময়ে রাশিয়ার সামরিক কর্মকাণ্ড এবং ন্যাটোর সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগও বাড়ছে।
রাশিয়াকে ন্যাটো নিয়ে সতর্কবার্তা?
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, র্যাটক্লিফ মস্কো সফরে রাশিয়াকে ন্যাটোভুক্ত কোনো দেশে হামলা না করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। বিশেষ করে রাশিয়া ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ‘পরীক্ষা’ করতে পারে—এমন মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের মধ্যেই এই বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তবে বিষয়টি নিয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ফলে র্যাটক্লিফের বার্তা কতটা কঠোর ছিল এবং রুশ পক্ষ কী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, তা নিয়ে কৌতূহল থেকেই যাচ্ছে।
আলোচনায় ইরানও
মস্কোর বৈঠকে ইরানের বিষয়টিও উঠে এসেছে বলে মার্কিন সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে ABC News। রাশিয়া ও ইরানের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্কের কারণে এই ইস্যুটিও ওয়াশিংটনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ রয়েছে।
অন্যদিকে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধ বন্ধের যে প্রচেষ্টা চলছে, তাতে এখনো বড় কোনো অগ্রগতি আসেনি। এই পরিস্থিতিতে একজন শীর্ষ মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তার সরাসরি মস্কো সফর কূটনৈতিক যোগাযোগের নতুন একটি চ্যানেলের ইঙ্গিতও দিতে পারে।
কয়েক ঘণ্টার সফর, কিন্তু প্রভাব বড়
র্যাটক্লিফের সফর ছিল স্বল্প সময়ের। তবে সময়ের দিক থেকে ছোট হলেও এর রাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেশি। ২০২১ সালের নভেম্বরে তৎকালীন সিআইএ পরিচালক উইলিয়াম বার্নসের মস্কো সফরের পর এ ধরনের শীর্ষ মার্কিন গোয়েন্দা সফর ছিল বিরল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সম্পর্ক যতই উত্তেজনাপূর্ণ হোক, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ অনেক সময় সংকট নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পেসকভও বলেছেন, দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে এবং এমন যোগাযোগকে পুরোপুরি নেতিবাচক হিসেবে দেখা উচিত নয়।
তবে র্যাটক্লিফের মস্কো সফরের প্রকৃত উদ্দেশ্য এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। এটি কি ন্যাটোকে ঘিরে সতর্কবার্তা, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে গোপন আলোচনা, নাকি ইরানসহ বৃহত্তর নিরাপত্তা ইস্যু—তার উত্তর মিলতে আরও সময় লাগতে পারে।
একটি বিষয় অবশ্য স্পষ্ট—ওয়াশিংটন ও মস্কোর সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর সময়ে সিআইএ প্রধানের গোপন মস্কো সফর বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন নজর যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ন্যাটোর পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।
