কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বজুড়ে বিশাল আকারের ডেটা সেন্টার নির্মাণ করছে। এসব স্থাপনা ক্লাউড কম্পিউটিং থেকে শুরু করে এআইয়ের বিভিন্ন সেবা পরিচালনার জন্য অপরিহার্য। কিন্তু প্রযুক্তির এই অগ্রগতির মূল্য কে দেবে, তা নিয়ে ইউরোপে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ ও পানির বিপুল ব্যবহার, পরিবেশের ওপর চাপ এবং স্থানীয় মানুষের মতামত উপেক্ষা করে প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিযোগে মহাদেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে মাইক্রোসফটের একটি ডেটা সেন্টার নির্মাণস্থলে ঢুকে পড়েছেন শতাধিক বিক্ষোভকারী। তাঁদের কয়েকজন ক্রেনের ওপর উঠে পড়েন এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষেও জড়ান।
৬ নভেম্বর শুক্রবার আমস্টারডামের নির্মাণস্থলে এই বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ অস্থায়ী বেড়া অতিক্রম করে প্রকল্প এলাকায় প্রবেশ করেন। কেউ ক্রেনে উঠে অবস্থান নেন, আবার কেউ মশাল ও আগুনের সংকেত জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানান। নির্মাণকাজ বন্ধের দাবিতে তাঁরা সেখানে অবস্থান করেন। পরে ডাচ পুলিশ অনধিকার প্রবেশের অভিযোগে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আটক করে।
কেন ডেটা সেন্টারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ?
ডেটা সেন্টার হলো এমন বিশাল স্থাপনা, যেখানে হাজার হাজার সার্ভার ও কম্পিউটার একসঙ্গে কাজ করে। এআইয়ের মতো প্রযুক্তি পরিচালনার জন্য এসব সার্ভারের বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। একই সঙ্গে সার্ভার ঠান্ডা রাখতে অনেক ক্ষেত্রে প্রচুর পানি ব্যবহার করতে হয়।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ইউরোপে নতুন নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণের ফলে স্থানীয় বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। যেসব এলাকায় পানির সংকট রয়েছে, সেখানে এসব স্থাপনার জন্য পানি ব্যবহার নিয়ে নতুন সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তাঁদের আরও আশঙ্কা, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে বিপুল মুনাফা অর্জন করলেও পরিবেশগত ও সামাজিক ব্যয়ের বড় অংশ বহন করতে হচ্ছে স্থানীয় জনগণকে।
আমস্টারডামের বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নামে এমন অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে, যার প্রকৃত প্রয়োজন ও সামাজিক উপকারিতা নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হয়নি।
১৫ দেশে ছড়িয়ে পড়ছে প্রতিবাদ
আমস্টারডামের ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো প্রতিবাদ নয়। স্টপ ডার্টি ডেটা সেন্টারস নামের একটি আন্দোলনের উদ্যোগে ইউরোপের অন্তত ১৫টি দেশে বিক্ষোভ ও বিভিন্ন কর্মসূচির পরিকল্পনা করা হয়েছে।
আয়ারল্যান্ড, পোল্যান্ড, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, স্পেন, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে আন্দোলনকারীরা নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা বা কঠোর নিয়ন্ত্রণের দাবি তুলেছেন।
জার্মানির বার্লিনের উপকণ্ঠে একটি ডেটা সেন্টারের সামনে বিক্ষোভ করেছেন পরিবেশকর্মীরা। পোল্যান্ডে দেশটির পার্লামেন্টের সামনে প্রায় ১০০ মানুষ প্রতিবাদ জানান। ইতালিতেও সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের প্রকল্পের বিরুদ্ধে জনমত বাড়ছে।
মিলানে গত ১০ অক্টোবর এক হাজারের বেশি মানুষ এবং প্রায় ৪০টি স্থানীয় সংগঠনের প্রতিনিধিরা ডেটা সেন্টারবিরোধী সমাবেশে অংশ নেন। সেখানে নতুন প্রকল্প অনুমোদনের আগে জাতীয় পর্যায়ে পরিবেশ ও অবকাঠামোগত নীতিমালা তৈরির দাবি জানানো হয়।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর যুক্তি কী?
মাইক্রোসফট জানিয়েছে, আমস্টারডামের বিক্ষোভ সম্পর্কে তারা অবগত। শান্তিপূর্ণভাবে মতপ্রকাশের অধিকারকে সম্মান করলেও বেআইনি কিংবা মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে এমন কর্মকাণ্ড সমর্থন করে না প্রতিষ্ঠানটি।
প্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর যুক্তি, আধুনিক অর্থনীতির জন্য ডেটা সেন্টার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকিং, চিকিৎসা, শিক্ষা, সরকারি সেবা, অনলাইন ব্যবসা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কার্যক্রম এসব অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল।
এআইয়ের ব্যবহার যত বাড়ছে, ততই দ্রুতগতির কম্পিউটিং সক্ষমতা প্রয়োজন হচ্ছে। এ কারণে ডেটা সেন্টার নির্মাণ বন্ধ করে দিলে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও ডিজিটাল অর্থনীতির প্রতিযোগিতায় ইউরোপ পিছিয়ে পড়তে পারে।
তবে পরিবেশকর্মীরা বলছেন, উন্নয়নের নামে বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে দেওয়া যায় না। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে আগেই স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করা।
বিনিয়োগের বিশাল অঙ্ক, বাড়ছে পরিবেশগত উদ্বেগ
ডেটা সেন্টার খাতে ইউরোপে বিপুল বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। একটি আন্তর্জাতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত ইউরোপে এ খাতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৫ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। বিশ্বব্যাপী সম্ভাব্য বিনিয়োগের প্রায় ১৮ শতাংশ হবে ইউরোপে।
এই বিপুল বিনিয়োগ প্রযুক্তি খাতে কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু স্থানীয় জনগণের আপত্তি উপেক্ষা করে প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া হলে সামাজিক বিরোধ আরও বাড়তে পারে।
নেদারল্যান্ডসে ইতিমধ্যে প্রায় ২০০টি ডেটা সেন্টার চালু রয়েছে, নির্মাণাধীন কিংবা পরিকল্পনাধীন। ফলে দেশটিতে বিদ্যুৎ, পানি এবং ভূমি ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়েছে।
এআই উন্নয়ন বনাম পরিবেশ সুরক্ষা
ইউরোপীয় দেশগুলো এখন দ্বিমুখী চাপে রয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং পরিবেশ সুরক্ষার প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করতে হচ্ছে।
বিক্ষোভকারীদের দাবি, নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণের আগে স্থানীয় জনগণের সম্মতি, পানির প্রাপ্যতা, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং পরিবেশগত প্রভাব যাচাই বাধ্যতামূলক করতে হবে। তাঁরা সব ডেটা সেন্টার বন্ধের দাবি করছেন না; বরং অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ বন্ধ করতে চান।
এই আন্দোলন প্রযুক্তি খাতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতের অর্থনীতিকে বদলে দিতে পারে, কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণের ব্যয় যদি সাধারণ মানুষ ও পরিবেশকে বহন করতে হয়, তাহলে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে।
