ইউরোপে তীব্র তাপপ্রবাহ ও শুষ্ক আবহাওয়ার মধ্যে একের পর এক দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্স, গ্রিস, ক্রোয়েশিয়া ও জার্মানিসহ কয়েকটি দেশে আগুন নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছেন দমকলকর্মীরা। কোথাও আগুন ঢুকে পড়েছে পর্যটনকেন্দ্রে, কোথাও বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হুমকির মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছে যে বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ক্রোয়েশিয়ার জনপ্রিয় পর্যটন শহর ওমিশে। প্রবল বাতাসের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং রাতের মধ্যে বসতবাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে যায়। স্থানীয় কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১,২০০ মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছেন। আগুনের তীব্রতার কারণে পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
গ্রিসেও পর্যটকদের সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। উত্তর গ্রিসের হালকিডিকি অঞ্চলে আগুনের কারণে পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দারা সড়ক ও সমুদ্রপথে নিরাপদ এলাকায় চলে যেতে বাধ্য হন। জনপ্রিয় পর্যটন এলাকায় আগুন পৌঁছে যাওয়ায় সেখানে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়।
ফ্রান্সেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে দাবানল মোকাবিলায় ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আগুনের বিস্তার ঠেকাতে দমকল বাহিনীর পাশাপাশি আকাশপথে পানি ছোড়ার বিমান ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। দীর্ঘদিনের খরা, উচ্চ তাপমাত্রা ও শুকনো উদ্ভিদ আগুন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে।
জার্মানিতেও দাবানল নিয়ে সতর্কতা জারি হয়েছে। একটি এলাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর প্রায় ১,৮০০ মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আগুনের সঙ্গে তাপপ্রবাহের কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার অবিস্ফোরিত গোলাবারুদের বিস্ফোরণ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ব্রিটেনেও দাবানলের সংখ্যা বাড়ছে। দেশটির বিভিন্ন এলাকায় আগুনের ঘটনা ঘটেছে এবং কিছু ঘটনায় মানুষকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। চরম আগুনঝুঁকির কারণে কোথাও কোথাও খোলা জায়গায় আগুন জ্বালানো বা ডিসপোজেবল বারবিকিউ ব্যবহারের ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দাবানলের পেছনে শুধু একটি কারণ নয়; উচ্চ তাপমাত্রা, দীর্ঘস্থায়ী শুষ্কতা, বাতাসের গতি ও ভূমির আর্দ্রতা কমে যাওয়ার মতো একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দীর্ঘ ও তীব্র তাপপ্রবাহের প্রবণতা বাড়ছে বলেও বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে আসছেন।
এই দাবানলের প্রভাব শুধু পরিবেশেই সীমাবদ্ধ নয়। ইউরোপের পর্যটনশিল্পও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ছে। সমুদ্রসৈকত, রিসোর্ট ও ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্রের কাছে আগুন পৌঁছে যাওয়ায় পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। একই সঙ্গে কৃষি, পরিবহন ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
ফলে ইউরোপের সাম্প্রতিক দাবানল এখন শুধু কয়েকটি দেশের দুর্যোগ নয়; এটি চরম আবহাওয়া, পর্যটন এবং জলবায়ু ঝুঁকির একটি বড় আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে।
