ইউরোপে রাশিয়া-জার্মানি উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। লেইপজিগ/হালে বিমানবন্দরে ড্রোন হামলার পেছনে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় এজেন্টদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছে জার্মানি। দেশটির সরকার জানিয়েছে, গোয়েন্দা তথ্য ও পুলিশি তদন্তের ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে তারা।
ঘটনাটি আগস্টের শুরুতে ঘটে। জার্মান কর্তৃপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, বিস্ফোরক বহনকারী ড্রোন বিমানবন্দর এলাকায় দেখা যায় এবং ইউক্রেনীয় পরিবহন বিমানের পাশাপাশি একটি কার্গো বিমানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘটনাটি নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে বড় উদ্বেগ তৈরি করে।
জার্মান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডোব্রিন্ট জানিয়েছেন, দেশটি রাশিয়ার তথাকথিত ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’-এর মুখোমুখি। তাঁর মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই; ইউরোপের অবকাঠামো, সাইবার নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও সম্ভাব্য লক্ষ্য হয়ে উঠছে।
বার্লিন ইতিমধ্যে পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। রাশিয়ার বন কনস্যুলেট বন্ধ করা এবং জার্মানিতে রাশিয়ান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম সীমিত করার মতো সিদ্ধান্ত সামনে এসেছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যেও রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও নিষেধাজ্ঞা ও ভ্রমণ বিধিনিষেধের পক্ষে জার্মানি সমর্থন চাইছে।
ঘটনার সময় ও পদ্ধতি নিয়েও তদন্ত চলছে। জার্মান কর্মকর্তারা মনে করছেন, বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় ড্রোন ব্যবহার করে হামলার চেষ্টা ইউরোপীয় নিরাপত্তার জন্য বড় সতর্কবার্তা।
তবে মস্কো অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। রাশিয়ার পক্ষ থেকে জার্মানির অভিযোগকে উসকানিমূলক ও ভিত্তিহীন বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ হামলার দায় নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত।
ঘটনাটি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাশিয়ার বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি, সাইবার হামলা ও নাশকতার অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। জার্মানি সম্প্রতি নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে সম্ভাব্য নাশকতার আশঙ্কাও খতিয়ে দেখছে।
বিশেষজ্ঞদের কাছে বিমানবন্দর হামলার অভিযোগের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ বিমানবন্দর সামরিক ও বেসামরিক উভয় ধরনের পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেখানে ড্রোন প্রবেশ করলে শুধু সম্পদের ক্ষতি নয়, বিমান চলাচল ও মানুষের জীবনও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
জার্মানি বলছে, তারা ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ হিসেবে দেখছে না। বরং ইউরোপের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য বৃহত্তর ‘হাইব্রিড অপারেশন’-এর অংশ হিসেবে বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। ইউরোপের কয়েকটি দেশও বার্লিনের পাশে দাঁড়িয়েছে।
এই ঘটনার রাজনৈতিক প্রভাবও রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই রাশিয়া ও ইউরোপের সম্পর্ক আরও তিক্ত হচ্ছে। জার্মানি ইউক্রেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমর্থক হওয়ায় মস্কোর সঙ্গে তার সম্পর্ক বিশেষভাবে সংবেদনশীল।
এখন প্রশ্ন হলো—লেইপজিগ বিমানবন্দরের ঘটনায় জার্মানির অভিযোগ ভবিষ্যতে আরও শক্ত প্রমাণ দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হবে কি না। যদি তা হয়, তবে ইউরোপের মাটিতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নাশকতা ও হাইব্রিড যুদ্ধের অভিযোগ নতুন মাত্রা পাবে।
আর যদি প্রমাণ দুর্বল হয়, তবুও ঘটনাটি ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা সামনে এনে দিয়েছে—একটি ছোট ড্রোনও এখন আন্তর্জাতিক উত্তেজনার বড় কারণ হয়ে উঠতে পারে।
