ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের প্রশ্নে শেষ পর্যন্ত ‘না’ ভোটই জিতল আইসল্যান্ডে। দীর্ঘদিনের বিতর্কের পর ২৯ আগস্ট অনুষ্ঠিত গণভোটে দেশটির ভোটাররা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সদস্যপদ নিয়ে আলোচনা পুনরায় শুরু করার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। ব্যবধান অবশ্য খুব বেশি ছিল না—প্রায় ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ ভোটার প্রস্তাবের বিপক্ষে এবং ৪৭ দশমিক ২ শতাংশ পক্ষে ভোট দিয়েছেন। ভোটার উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য, প্রায় ৮২ দশমিক ৫ শতাংশ।
ফলাফলটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ আইসল্যান্ড বহু বছর ধরেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখলেও পূর্ণ সদস্যপদ নিয়ে দ্বিধায় ছিল। দেশটি ইউরোপীয় অর্থনৈতিক এলাকার অংশ এবং ইউরোপের একক বাজারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কিন্তু পূর্ণ ইইউ সদস্যপদ মানে কৃষি, মৎস্যসম্পদসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ব্রাসেলসের নীতির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়া।
আর এখানেই আইসল্যান্ডের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা—মৎস্যসম্পদ।
আইসল্যান্ডের অর্থনীতিতে মাছ ও মৎস্যসম্পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মোট জিডিপিতে খাতটির অবদান প্রায় ১৫ শতাংশ এবং রপ্তানি আয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ এর সঙ্গে যুক্ত বলে সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাধারণ মৎস্যনীতি ভবিষ্যতে আইসল্যান্ডের নিজস্ব জলসীমা ও মাছ ধরার অধিকারকে প্রভাবিত করতে পারে—এমন আশঙ্কা দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে।
গণভোটে রাজধানী রেইকিয়াভিকের কিছু এলাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনার পক্ষে তুলনামূলক বেশি সমর্থন দেখা গেলেও গ্রামীণ অঞ্চল ও শহরতলির ভোটারদের বড় অংশ প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। বিশেষ করে মৎস্যশিল্পের সঙ্গে যুক্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইইউ সদস্যপদ নিয়ে সতর্কতা প্রবল ছিল।
তবে ‘না’ শিবিরের যুক্তি শুধু মাছের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। অনেক ভোটার মনে করেন, আইসল্যান্ডের মতো ছোট একটি দেশের জন্য নিজের আইন, অর্থনীতি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে সরকারের পক্ষে থাকা দলগুলো যুক্তি দিয়েছিল, বর্তমান বিশ্বে ইইউর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আইসল্যান্ডকে অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে সুবিধা দিতে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে ইউরোপীয় কাঠামোর ভেতরে থাকা দেশটির জন্য লাভজনক হতে পারে বলে তারা মনে করেছিল।
প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্তুন ফ্রস্টাদোত্তির ফলাফল মেনে নিয়ে ভোটারদের সিদ্ধান্তকে সম্মান করার কথা জানিয়েছেন। তাঁর সরকারের অবস্থান ছিল, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে আপাতত তারা পূর্ণ সদস্যপদের পথে এগোতে আগ্রহী নয়।
এই ফলাফল ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, আর্কটিক অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব এবং ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে নতুন বাস্তবতার মধ্যে ইইউ দীর্ঘদিন ধরে উত্তর ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
কিন্তু আইসল্যান্ডের ভোট দেখিয়ে দিল, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সুবিধার যুক্তি থাকলেও জাতীয় সম্পদ ও সার্বভৌম সিদ্ধান্তের প্রশ্নে ভোটাররা সহজে অবস্থান পরিবর্তন করতে রাজি নন।
এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—আইসল্যান্ড ইইউকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করছে না। দেশটি ইতোমধ্যেই ইউরোপীয় অর্থনৈতিক এলাকার মাধ্যমে ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ফলে গণভোটের ফলকে ‘ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্নতা’ হিসেবে দেখার চেয়ে পূর্ণ ইইউ সদস্যপদের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা বেশি সঠিক।
এখন প্রশ্ন, ভবিষ্যতে পরিস্থিতি বদলাবে কি না। অর্থনীতি, মৎস্যসম্পদ, আর্কটিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিবর্তন আইসল্যান্ডের জনমতকে আবারও প্রভাবিত করতে পারে।
তবে আপাতত আইসল্যান্ডের বার্তা স্পষ্ট—ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু পূর্ণ সদস্যপদের দরজা এখনই খুলছে না।
