মধ্য এশিয়ার কূটনীতিতে বড় ধরনের আলোড়ন তৈরি করে আসন্ন শাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন বা SCO সম্মেলন। কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে আগামী ৩১ আগস্ট ও ১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবারের শীর্ষ সম্মেলন। এতে চীন, রাশিয়া ও ভারতের শীর্ষ নেতৃত্বসহ SCO-এর সদস্য দেশগুলোর নেতারা অংশ নেবেন। ফলে একই টেবিলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতি মধ্য এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে যাচ্ছে।
এবারের সম্মেলন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ SCO তার ২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রেক্ষাপটে নতুন নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনা করবে। বর্তমানে সংগঠনটির ১০টি পূর্ণ সদস্য দেশ রয়েছে—চীন, রাশিয়া, ভারত, ইরান, পাকিস্তান, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান ও বেলারুশ। এই দেশগুলোর সম্মিলিত জনসংখ্যা বিশ্বের প্রায় ৩.৪ বিলিয়ন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তাদের অংশও উল্লেখযোগ্য।
বিশকেক সম্মেলনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হতে যাচ্ছে শি-পুতিন-মোদি উপস্থিতি। রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সফর নিশ্চিত করা হয়েছে এবং তিনি সম্মেলনের পাশাপাশি একাধিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। ক্রেমলিনের তথ্য অনুযায়ী, শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তাঁর বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা ছাড়াও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যু এবং রাশিয়া-চীন জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
অন্যদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২৯ আগস্ট থেকে উজবেকিস্তান ও কিরগিজস্তান সফর করছেন। বিশকেকে SCO সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। ভারতের জন্য এই সফরের অন্যতম লক্ষ্য মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা।
এই সম্মেলনের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে কারণ বিশ্ব এখন একাধিক সংঘাত ও শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা, চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতা এবং এশিয়ায় নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর প্রশ্ন SCO নেতাদের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেতে পারে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানও সম্মেলনে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে এবং তাঁর সঙ্গে পুতিনের আলাদা বৈঠকের সম্ভাবনাও রয়েছে।
চীন ও রাশিয়ার জন্য SCO হলো পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বাইরে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। বেইজিং মধ্য এশিয়ায় অবকাঠামো, বাণিজ্য ও জ্বালানি বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজের উপস্থিতি বাড়িয়েছে। মস্কোও ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলকে নিজের কৌশলগত প্রভাববলয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখে।
তবে ভারতের অবস্থান কিছুটা ভিন্ন। নয়াদিল্লি একই সঙ্গে রাশিয়া, চীন এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ধরে রাখতে চায়। বিশেষ করে চীন ও ভারতের সীমান্ত বিরোধ থাকা সত্ত্বেও দুই দেশ সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। আগামী সেপ্টেম্বরের BRICS সম্মেলনে শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য ভারত সফরও এই বৃহত্তর কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর জন্যও এই সম্মেলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়া ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য রেখে নিজেদের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষা করে আসছে। একই সঙ্গে তারা ভারত, তুরস্ক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য শক্তির সঙ্গেও সম্পর্ক বাড়াচ্ছে।
কিরগিজস্তানের প্রেসিডেন্ট সাদির জাপারভের জন্যও সম্মেলনটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। তাঁর দেশ SCO-এর আয়োজক হিসেবে মধ্য এশিয়ার কূটনৈতিক মানচিত্রে নিজেদের গুরুত্ব তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে। প্রায় ২১টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান বা উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধির উপস্থিতির সম্ভাবনা থাকায় বিশকেক কয়েক দিনের জন্য আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হতে যাচ্ছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—বিশকেকের এই বৈঠক কি SCO-কে আরও কার্যকর ভূরাজনৈতিক জোটে পরিণত করবে? নাকি চীন, রাশিয়া ও ভারতের ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থের কারণে এটি মূলত আলোচনা ও কূটনীতির প্ল্যাটফর্ম হিসেবেই থাকবে?
যাই হোক, শি, পুতিন ও মোদির একই সম্মেলনে উপস্থিতি নিশ্চিতভাবেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্য একটি বড় ঘটনা। মধ্য এশিয়াকে ঘিরে চীন-রাশিয়া-ভারতের প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতার নতুন সমীকরণ আগামী দিনগুলোতে আরও স্পষ্ট হতে পারে। আর সেই নতুন সমীকরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হতে যাচ্ছে কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেক।
