লাইবেরিয়ার রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে তীব্র আলোড়ন। দেশটির সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জুয়েল হাওয়ার্ড-টেইলরকে আন্তর্জাতিক মাদক পাচারচক্রের তদন্তে মাদক পাচার, অর্থপাচারসহ একাধিক অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে সরকার। দেশ ছাড়ার চেষ্টা করার সময় রাজধানী মনরোভিয়ার রবার্টস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে আটক করা হয় বলে জানিয়েছে লাইবেরিয়ার বিচার মন্ত্রণালয়।
৬৩ বছর বয়সী হাওয়ার্ড-টেইলর ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়েহর প্রশাসনে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি এবং লাইবেরিয়ার সরকারও জানিয়েছে, আদালতে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত তিনি নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হবেন।
বিমান ধরার আগেই আটক
লাইবেরিয়ার বিচার মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশ ছাড়ার উদ্দেশ্যে রবার্টস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর হাওয়ার্ড-টেইলরকে যাত্রা করতে বাধা দেওয়া হয়। পরে তাকে লাইবেরিয়া ন্যাশনাল পুলিশের সদর দপ্তরে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়।
তার বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রিত মাদক বা পদার্থের লাইসেন্সবিহীন আমদানি, বিক্রি, বিতরণ ও পরিবহন, অবৈধ মাদক পাচার, অপরাধে প্ররোচনা, অপরাধে সহায়তা, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং অর্থপাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তে পাওয়া প্রমাণ পর্যালোচনার পরই এসব অভিযোগ আনা হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
কোটি কোটি ডলারের কোকেন জব্দের পর তদন্তে নতুন মোড়
হাওয়ার্ড-টেইলরের বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ এসেছে এমন এক সময়, যখন লাইবেরিয়া সম্প্রতি দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় মাদকবিরোধী অভিযানের মুখোমুখি হয়েছে। জুলাই মাসে রাজধানী মনরোভিয়ার কাছাকাছি একটি অভিযানে প্রায় চার টন কোকেন জব্দ করা হয়, যার মূল্য বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের হিসাবে প্রায় ৩১৭ থেকে ৩৩৬ মিলিয়ন ডলার।
কর্তৃপক্ষের দাবি, বিপুল পরিমাণ ওই কোকেন ইউরোপে পাচারের উদ্দেশ্যে আনা হয়েছিল এবং অভিযানটি একটি জটিল আন্তর্জাতিক মাদক পাচার নেটওয়ার্কের অস্তিত্ব সামনে নিয়ে আসে। তবে সরকারি ও আন্তর্জাতিক সংবাদসূত্রে বলা হয়েছে, বিশাল কোকেন জব্দের ঘটনাটি এবং হাওয়ার্ড-টেইলরের বিরুদ্ধে আনা মামলার সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন তথ্য প্রকাশিত হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পৃথক তদন্তের কথাও জানিয়েছে।
তিন বিদেশিকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে
একই তদন্তে দুই ক্রোয়েশীয় এবং একজন ইউক্রেনীয় নাগরিকের বিরুদ্ধেও অনুপস্থিত অবস্থায় অভিযোগ আনা হয়েছে। লাইবেরিয়ার সরকার জানিয়েছে, তাদের অবস্থান শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তদন্তের আওতায় শুধু মাদক পরিবহনকারীদের নয়, বরং কথিত পাচারচক্রের অর্থদাতা, সংগঠক, সহায়তাকারী এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরে সম্ভাব্য রক্ষাকবচদেরও চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মকর্তাকেও জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা হয়েছে।
‘কোনো রাজনৈতিক পরিচয় সুরক্ষা দেবে না’
লাইবেরিয়ার সরকার এই তদন্তে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকার অঙ্গীকার করেছে। বিচারমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তর বলেছে, বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকলে কোনো রাজনৈতিক পদ, প্রভাবশালী সম্পর্ক বা বিদেশি নাগরিকত্ব কাউকে তদন্তের ঊর্ধ্বে রাখবে না।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অভিযান কেবল কয়েকজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং আন্তর্জাতিক মাদক পাচার নেটওয়ার্কের আর্থিক, লজিস্টিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যেই তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই মামলা?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিম আফ্রিকা দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ইউরোপে কোকেন পাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট রুট হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। দুর্বল সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক পাচারকারীরা অঞ্চলটি ব্যবহার করছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে।
এই পরিস্থিতিতে লাইবেরিয়ার একজন সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ দেশটির রাজনীতি ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এখন সবার নজর আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে এটি হবে লাইবেরিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অপরাধ মামলা; আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে হাওয়ার্ড-টেইলরের জন্য শুরু হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রাজনৈতিক ও আইনি লড়াই।
