ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির ব্যক্তিগত জীবনে বড় ধাক্কা। টেলিভিশনে প্রচারিত একাধিক অশালীন ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য ঘিরে তীব্র বিতর্কের মধ্যে দীর্ঘদিনের সঙ্গী আন্দ্রেয়া জিয়ামব্রুনোর সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করার ঘোষণা দেন মেলোনি। প্রায় এক দশকের সম্পর্কের অবসানের এই ঘোষণা আসে বিতর্কিত মন্তব্য ও অফ-এয়ার ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পরপরই।
মেলোনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানান, জিয়ামব্রুনোর সঙ্গে তার সম্পর্ক এখানেই শেষ হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, দুজনের পথ অনেক দিন ধরেই আলাদা হয়ে যাচ্ছিল এবং এবার সেই বাস্তবতা মেনে নেওয়ার সময় এসেছে।
ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা জিয়ামব্রুনো ছিলেন ইতালির প্রভাবশালী মিডিয়া প্রতিষ্ঠান মিডিয়াসেটের একজন টেলিভিশন উপস্থাপক। তার উপস্থাপিত অনুষ্ঠান ‘দিয়ারিও দেল জর্নো’-এর অফ-এয়ার ফুটেজ প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই বিতর্ক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
ক্যামেরার বাইরে যা বলেছিলেন জিয়ামব্রুনো
বিতর্কের সূত্রপাত হয় ইতালির ব্যঙ্গাত্মক টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘স্ট্রিশা লা নোতিজিয়া’-তে প্রচারিত কিছু অফ-এয়ার ফুটেজ নিয়ে। সেখানে জিয়ামব্রুনোকে নারী সহকর্মীদের সঙ্গে এমন কিছু মন্তব্য করতে শোনা যায়, যেগুলোকে ইতালীয় গণমাধ্যমে অশালীন ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ হিসেবে ব্যাপকভাবে তুলে ধরা হয়।
একটি ফুটেজে তাকে এক নারী সহকর্মীর সঙ্গে অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ভঙ্গিতে কথা বলতে দেখা যায়। আরেকটি কথোপকথনে তিনি নিজের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও যৌন জীবন নিয়ে মন্তব্য করেন এবং সহকর্মীকে এমন একটি সম্পর্কে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দেন।
ভিডিওগুলো প্রচারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইতালীয় গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। বিষয়টি কেবল একজন টেলিভিশন উপস্থাপকের আচরণ নিয়ে বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকেনি; কারণ জিয়ামব্রুনো তখন ছিলেন দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দীর্ঘদিনের সঙ্গী।
মেলোনির ঘোষণা এলো দ্রুত
ভিডিও সম্প্রচারের পর খুব বেশি সময় নেননি মেলোনি। ২০ অক্টোবর ২০২৩ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় তিনি জানান, জিয়ামব্রুনোর সঙ্গে প্রায় ১০ বছরের সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটেছে।
মেলোনি তার সাবেক সঙ্গীকে একসঙ্গে কাটানো বছরগুলোর জন্য ধন্যবাদ জানান। তাদের সম্পর্ক থেকে জন্ম নেওয়া মেয়ে জিনেভরার কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন তিনি। মেলোনির ভাষ্য অনুযায়ী, মেয়েটিই তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ।
তিনি আরও জানান, তাদের দুজনের পথ আগেই আলাদা হয়ে গিয়েছিল। ফলে সম্পর্কের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ছিল দীর্ঘদিনের দূরত্বের পরবর্তী একটি সিদ্ধান্ত।
মেলোনি একই সঙ্গে মেয়ের ব্যক্তিগত জীবন ও মানসিক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানান। তিনি স্পষ্ট করে দেন, রাজনৈতিক বিতর্কের মাঝেও সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের সম্পর্ককে আলাদা জায়গায় দেখছেন।
‘আমাকে দুর্বল করার চেষ্টা’ প্রসঙ্গেও বার্তা
মেলোনির বিবৃতির আরেকটি অংশ বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। তিনি ইঙ্গিত দেন, ব্যক্তিগত জীবনকে কেন্দ্র করে তাকে দুর্বল করার চেষ্টা হয়ে থাকলে সেটি সফল হবে না।
একটি উপমা ব্যবহার করে তিনি বলেন, পানির ফোঁটা পাথর ক্ষয় করার চেষ্টা করলেও পাথর পাথরই থাকে। এই মন্তব্যকে ইতালীয় সংবাদমাধ্যম তার রাজনৈতিক দৃঢ়তার বার্তা হিসেবেও তুলে ধরে।
তবে মেলোনি তার বিবৃতিতে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো একক ঘটনাকে একমাত্র কারণ হিসেবে উল্লেখ করেননি। বরং বলেছেন, তাদের পথ অনেক আগেই আলাদা হয়ে গিয়েছিল এবং এবার সেই বাস্তবতাকে স্বীকার করার সময় এসেছে।
এর আগেও বিতর্কে জড়িয়েছিলেন জিয়ামব্রুনো
অফ-এয়ার ফুটেজের ঘটনাটি ছিল না জিয়ামব্রুনোকে ঘিরে প্রথম বিতর্ক। এর আগেও তার টেলিভিশন অনুষ্ঠানে নারীদের নিয়ে করা মন্তব্য নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল।
২০২৩ সালের আগস্টে একটি অনুষ্ঠানে ধর্ষণ ও নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে তার মন্তব্য ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করে। সে সময় তিনি তরুণীদের উদ্দেশে এমন বক্তব্য দেন, যা ইতালির বিভিন্ন মহলে সমালোচিত হয়। পরে বিষয়টি নিয়ে দেশটির সংবাদমাধ্যমে বিস্তর আলোচনা হয়।
এর ফলে জিয়ামব্রুনোর ব্যক্তিগত ও পেশাগত আচরণ নিয়ে আগেই প্রশ্ন উঠেছিল। নতুন ভিডিও প্রকাশের পর পুরোনো বিতর্কও আবার সামনে চলে আসে।
টেলিভিশন অনুষ্ঠান থেকেও সরে দাঁড়াতে হয়
সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণার পাশাপাশি জিয়ামব্রুনোর পেশাগত অবস্থানও চাপে পড়ে। বিতর্কিত ফুটেজ প্রকাশের পর তার উপস্থাপিত অনুষ্ঠান নিয়ে মিডিয়াসেটের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং তাকে অনুষ্ঠান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
ফলে কয়েক দিনের ব্যবধানে ঘটনাটি ব্যক্তিগত সম্পর্কের সংকট থেকে একটি বড় মিডিয়া বিতর্কে পরিণত হয়।
রাজনীতির সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনের সংঘাত
মেলোনি ইতালির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। ফলে তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রকাশ্যে আসা যেকোনো ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই দেশটির রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম অঙ্গনে বাড়তি মনোযোগ পেয়েছে।
তবে সম্পর্কের সমাপ্তি ঘোষণা করতে গিয়ে মেলোনি বিষয়টিকে রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত না করে মূলত পরিবার ও সন্তানের প্রসঙ্গেই জোর দেন। তার বক্তব্যে ব্যক্তিগত সম্পর্কের সমাপ্তি এবং রাজনৈতিক দায়িত্বকে আলাদা রাখার চেষ্টা স্পষ্ট ছিল।
অন্যদিকে জিয়ামব্রুনোর বিতর্কিত মন্তব্য ও ভিডিও প্রকাশের ঘটনা ইতালিতে সংবাদমাধ্যমের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, টেলিভিশন ব্যক্তিত্বদের আচরণ এবং জনজীবনে থাকা ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করে।
সব মিলিয়ে, প্রায় এক দশকের সম্পর্কের পর মেলোনি ও জিয়ামব্রুনোর বিচ্ছেদ ইতালির রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি দেশটির গণমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তবে মেলোনির নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, সম্পর্কের দূরত্ব নতুন করে তৈরি হয়নি; বরং দীর্ঘদিন ধরেই দুজনের পথ আলাদা হয়ে যাচ্ছিল। অশালীন মন্তব্য ও ফাঁস হওয়া ভিডিও সেই সমাপ্তিকে কেবল প্রকাশ্যে নিয়ে আসে।
