যে গণনা সম্পন্ন করতে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সুপারকম্পিউটারের প্রায় ১১০ বছর লাগতে পারে, সেই নির্দিষ্ট কাজ মাত্র ১৯ সেকেন্ডে সম্পন্ন করেছে আইবিএমের একটি কোয়ান্টাম প্রসেসর। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত গবেষণার এই ফলাফল কম্পিউটার প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ ধরনের একটি গণনামূলক পরীক্ষায় পাওয়া এই সাফল্য দেখিয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু জটিল সমস্যা সমাধানে কোয়ান্টাম কম্পিউটার প্রচলিত কম্পিউটারের তুলনায় বিপুল সুবিধা দিতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে কোয়ান্টাম কম্পিউটার এখন সব ধরনের কাজে সুপারকম্পিউটারের চেয়ে দ্রুত। পরীক্ষাটি ছিল বিশেষ ধরনের কোয়ান্টাম গণনা, যেখানে এলোমেলোভাবে তৈরি কোয়ান্টাম সার্কিটের ফলাফল সংগ্রহ করা হয়। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, একই কাজ নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে সম্পন্ন করতে সুপারকম্পিউটারের প্রায় এক শতাব্দীরও বেশি সময় লাগতে পারে।
১৯ সেকেন্ডে আসলে কী করেছে কোয়ান্টাম কম্পিউটার?
আইবিএমের ‘নাইটহক আরটু’ নামের কোয়ান্টাম প্রসেসর ব্যবহার করে গবেষকেরা এই পরীক্ষা চালান। এতে ৬১টি কোয়ান্টাম বিট বা কিউবিট নিয়ে তৈরি একটি বিশেষ কোয়ান্টাম সার্কিটের ফলাফল সংগ্রহ করা হয়। মাত্র ১৯ সেকেন্ডে প্রসেসরটি ওই সার্কিট থেকে ১০ লাখ নমুনা তৈরি করতে সক্ষম হয়।
এখানে নমুনা বলতে সাধারণ কোনো ছবি, লেখা কিংবা হিসাবের উত্তর বোঝায় না। বরং কোয়ান্টাম সার্কিটের মধ্য দিয়ে তথ্য প্রবাহিত হওয়ার পর যে সম্ভাব্য ফলাফলগুলো পাওয়া যায়, সেগুলোর একটি বড় সংগ্রহ বোঝানো হয়েছে।
গবেষণায় ব্যবহৃত পদ্ধতিটির নাম ‘র্যান্ডম সার্কিট স্যাম্পলিং’। এটি কোয়ান্টাম কম্পিউটারের সক্ষমতা যাচাইয়ের একটি বিশেষ মানদণ্ড। সার্কিটে কিউবিটের সংখ্যা এবং গণনার ধাপ বাড়লে প্রচলিত কম্পিউটারে একই ফলাফলের সম্ভাব্য বণ্টন অনুকরণ করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
গবেষকদের মডেলভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, একই ধরনের ফলাফল নির্দিষ্ট মান বজায় রেখে তৈরি করতে সুপারকম্পিউটারের প্রায় ১১০ বছর লাগতে পারে। তবে এই সময় সরাসরি সুপারকম্পিউটারে পরীক্ষা চালিয়ে মাপা হয়নি; এটি নির্দিষ্ট গণনাপদ্ধতি ও অনুমানের ভিত্তিতে করা হিসাব।
কেন কোয়ান্টাম কম্পিউটার এত দ্রুত?
প্রচলিত কম্পিউটার তথ্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য বিট ব্যবহার করে। একটি বিটের মান হয় শূন্য অথবা এক। অন্যদিকে, কোয়ান্টাম কম্পিউটারের মৌলিক একক হলো কিউবিট। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম অনুসারে কিউবিট এমন অবস্থায় থাকতে পারে, যা শূন্য ও একের সমন্বিত সম্ভাবনা ধারণ করে। এই বৈশিষ্ট্যকে বলা হয় ‘সুপারপজিশন’।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ‘এনট্যাঙ্গলমেন্ট’, যেখানে একাধিক কিউবিটের কোয়ান্টাম অবস্থা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে যায়। কোয়ান্টাম কম্পিউটার সুপারপজিশন, এনট্যাঙ্গলমেন্ট এবং কোয়ান্টাম ইন্টারফেরেন্স ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ধরনের গণনা সম্পাদন করতে পারে।
তবে কিউবিটকে একই সঙ্গে অনেক সাধারণ বিটের মতো ধরে নিয়ে সব উত্তর একসঙ্গে পড়ে ফেলা যায় না। কোয়ান্টাম পরিমাপের নিজস্ব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই কোয়ান্টাম কম্পিউটারের প্রকৃত সুবিধা নির্ভর করে সমস্যার ধরন, অ্যালগরিদম এবং যন্ত্রটির নির্ভুলতার ওপর।
সুপারকম্পিউটারের সঙ্গে তুলনা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
সুপারকম্পিউটার আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম শক্তিশালী প্রযুক্তি। আবহাওয়ার পূর্বাভাস, মহাকাশ গবেষণা, জটিল পদার্থবিজ্ঞানের হিসাব এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো ক্ষেত্রে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হাজার হাজার প্রসেসর একসঙ্গে কাজ করে বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে।
কিন্তু কোয়ান্টাম কম্পিউটারের কাজের ধরন আলাদা। নির্দিষ্ট কিছু কোয়ান্টাম সমস্যা প্রচলিত কম্পিউটারে অনুকরণ করা কঠিন হতে পারে, বিশেষ করে যখন কিউবিটের সংখ্যা এবং গণনার গভীরতা বাড়ে। এই কারণেই র্যান্ডম সার্কিট স্যাম্পলিংয়ের মতো পরীক্ষা প্রযুক্তিটির অগ্রগতি যাচাইয়ে ব্যবহার করা হয়।
তবে একটি পরীক্ষায় দ্রুত ফলাফল পাওয়া মানেই সব সমস্যায় একই সুবিধা পাওয়া যাবে, এমন নয়। গবেষকেরা যে নির্দিষ্ট কাজের জন্য সময় তুলনা করেছেন, তার বাইরে অন্য ধরনের গণনায় কোয়ান্টাম প্রসেসরের সুবিধা আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে।
আগেও এমন বিস্ময় দেখিয়েছে কোয়ান্টাম প্রযুক্তি
২০১৯ সালে গুগলের ‘সাইকামোর’ কোয়ান্টাম প্রসেসর একটি বিশেষ গণনা প্রায় ২০০ সেকেন্ডে সম্পন্ন করে। গবেষকদের তৎকালীন হিসাব অনুযায়ী, একই কাজ প্রচলিত সুপারকম্পিউটারে করতে প্রায় ১০ হাজার বছর লাগতে পারত। এই ফলাফল কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের অগ্রগতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
পরবর্তী সময়ে কোয়ান্টাম প্রসেসরের উন্নতি, নতুন অ্যালগরিদম এবং প্রচলিত কম্পিউটারের অনুকরণক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে এ ধরনের তুলনা আরও জটিল হয়ে উঠেছে। কোন পদ্ধতিতে হিসাব করা হচ্ছে, কী পরিমাণ নির্ভুলতা প্রয়োজন এবং সুপারকম্পিউটারে কী ধরনের উন্নত কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে—এসব বিষয় ফলাফলকে প্রভাবিত করে।
আইবিএমের সাম্প্রতিক পরীক্ষাটিও সেই ধারাবাহিক অগ্রগতির অংশ। এর গুরুত্ব শুধু দ্রুত ফলাফল পাওয়া নয়; বরং কোয়ান্টাম যন্ত্রে আরও বড় ও জটিল গণনা সম্পাদনের সম্ভাবনা যাচাই করা।
ভবিষ্যতে ওষুধ আবিষ্কার থেকে নতুন উপাদান তৈরিতে ব্যবহার
কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাগুলোর একটি হলো প্রকৃতির অতি ক্ষুদ্র কণার আচরণ অনুকরণ করা। অণু, পরমাণু ও ইলেকট্রনের পারস্পরিক ক্রিয়া প্রচলিত কম্পিউটারে নির্ভুলভাবে হিসাব করা অনেক ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠিন। উন্নত কোয়ান্টাম কম্পিউটার ভবিষ্যতে এসব সমস্যা বিশ্লেষণে সহায়তা করতে পারে।
এর ফলে নতুন ওষুধের অণু খুঁজে বের করা, উন্নত ব্যাটারির উপাদান তৈরি, রাসায়নিক বিক্রিয়া বোঝা এবং আরও কার্যকর শিল্পপ্রযুক্তি উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাস্তব প্রয়োগের জন্য আরও নির্ভুল ও ত্রুটিসহিষ্ণু কোয়ান্টাম যন্ত্র প্রয়োজন।
এখনো বড় বাধা ত্রুটি ও নির্ভরযোগ্যতা
কোয়ান্টাম কম্পিউটারের অন্যতম বড় সমস্যা হলো কিউবিটের অত্যন্ত সংবেদনশীলতা। তাপমাত্রা, পরিবেশের ক্ষুদ্র পরিবর্তন কিংবা অন্যান্য বাহ্যিক প্রভাবের কারণে কোয়ান্টাম তথ্য নষ্ট হতে পারে। ফলে গণনার ফলাফলে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এই সমস্যা সমাধানে গবেষকেরা কোয়ান্টাম ত্রুটি সংশোধন, উন্নত প্রসেসর এবং নির্ভরযোগ্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছেন। ভবিষ্যতে বড় আকারের কার্যকর কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি করতে হলে শুধু কিউবিটের সংখ্যা বাড়ালেই চলবে না; সেগুলোকে দীর্ঘ সময় নির্ভুলভাবে পরিচালনা করার ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।
আইবিএমের ১৯ সেকেন্ডের পরীক্ষাটি তাই প্রযুক্তির সম্ভাবনার একটি উল্লেখযোগ্য প্রদর্শন, কিন্তু সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন হিসাব কিংবা সব ধরনের বৈজ্ঞানিক সমস্যায় কোয়ান্টাম কম্পিউটার এখনই সুপারকম্পিউটারকে ছাড়িয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার ভিত্তি নয়।
কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিশেষ পরীক্ষায় পাওয়া গতির সুবিধাকে বাস্তব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধানে কাজে লাগানো। সেই লক্ষ্য অর্জিত হলে চিকিৎসাবিজ্ঞান, রসায়ন, জ্বালানি ও উপাদানবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে যেতে পারে।
