দিনের আলো হঠাৎ কমে গেল। সূর্যকে ঢেকে দিল চাঁদ। কয়েক মিনিটের জন্য অনেক জায়গায় দিনের আকাশে নেমে এলো রাতের মতো অন্ধকার। বিরল এই দৃশ্য দেখতে ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্তে জড়ো হয়েছিলেন লাখো মানুষ। ১২ আগস্টের পূর্ণ সূর্যগ্রহণ তাই শুধু জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের নয়, সাধারণ মানুষের কাছেও হয়ে উঠেছে বছরের অন্যতম আকর্ষণীয় মহাজাগতিক ঘটনা।
চাঁদ যখন পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে এসে সূর্যের পুরো চাকতিকে ঢেকে দেয়, তখন তাকে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ বলা হয়। এই সময় চাঁদের ছায়া পৃথিবীর একটি সরু অঞ্চলের ওপর দিয়ে অতিক্রম করে। ওই অঞ্চলে অবস্থান করা মানুষ কয়েক মুহূর্তের জন্য সূর্যের সম্পূর্ণ ঢাকা পড়ার দৃশ্য দেখতে পারেন।
এবারের গ্রহণের বিশেষত্ব ছিল এর বিস্তৃত দৃশ্যপথ। আইসল্যান্ড, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপের বিভিন্ন অংশে মানুষ গ্রহণ প্রত্যক্ষ করেন। স্পেনের বিভিন্ন স্থানেও বিপুলসংখ্যক মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
স্পেনে অনেক শহর ও পর্যটনকেন্দ্রে বিশেষ পর্যবেক্ষণ আয়োজন করা হয়। কোথাও মানুষ বিশেষ সুরক্ষা চশমা পরে গ্রহণ দেখেছেন, কোথাও আবার বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সঙ্গে নিয়ে আয়োজন করা হয়েছে পর্যবেক্ষণ অনুষ্ঠান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও গ্রহণের ছবি ও ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
পূর্ণগ্রহণের সময় সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্যগুলোর একটি হলো করোনা, অর্থাৎ সূর্যের বাইরের অত্যন্ত উজ্জ্বল বায়ুমণ্ডল। স্বাভাবিক অবস্থায় সূর্যের তীব্র আলোয় এটি দেখা যায় না। কিন্তু চাঁদ যখন সূর্যের মূল চাকতি সম্পূর্ণ ঢেকে দেয়, তখন অন্ধকার আকাশে সূর্যের চারপাশে সাদা আলোর মুকুটের মতো করোনা দেখা যায়।
গ্রহণের সময় তাপমাত্রা সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে এবং পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর আচরণেও পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। দিনের আলো হঠাৎ কমে যাওয়ায় অনেক প্রাণী রাত নেমে এসেছে বলে আচরণ করতে পারে।
তবে সূর্যগ্রহণ দেখার সময় বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। খালি চোখে সূর্যের দিকে তাকানো চোখের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। সাধারণ সানগ্লাস সূর্যগ্রহণ দেখার জন্য নিরাপদ নয়; এজন্য উপযুক্ত সোলার ভিউয়ার বা গ্রহণ পর্যবেক্ষণের বিশেষ চশমা ব্যবহার করা প্রয়োজন।
এই গ্রহণকে ঘিরে ইউরোপে পর্যটনও বেড়েছে। গ্রহণের পথের কাছাকাছি থাকা বিভিন্ন শহর ও অঞ্চল আগে থেকেই দর্শনার্থীদের স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নেয়। আকাশ পরিষ্কার থাকায় কিছু এলাকায় মানুষ প্রত্যাশার চেয়েও ভালো দৃশ্য পেয়েছেন।
একটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ একই জায়গা থেকে বারবার দেখা যায় না। কারণ পূর্ণগ্রহণের ছায়াপথ পৃথিবীর তুলনামূলকভাবে ছোট একটি অংশের ওপর দিয়ে অতিক্রম করে। ফলে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে এমন দৃশ্য দেখতে কয়েক দশক পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
১২ আগস্টের এই ঘটনা তাই বিজ্ঞানীদের জন্য গবেষণার সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্যও বিরল মহাজাগতিক অভিজ্ঞতা হয়ে থাকল। আকাশে কয়েক মিনিটের সেই অন্ধকার হয়তো দ্রুত কেটে গেছে, কিন্তু সূর্য-চাঁদ-পৃথিবীর বিরল এই মহাজাগতিক মিলনের ছবি বহুদিন মানুষের মনে থাকবে।
